লা লিগার রাজা বার্সেলোনার চ্যাম্পিয়নস লিগে বারবার ব্যর্থতার রহস্য
বার্সেলোনার ইউরোপে ব্যর্থতার কারণ: লা লিগা বনাম চ্যাম্পিয়নস লিগ

লা লিগার রাজা বার্সেলোনার চ্যাম্পিয়নস লিগে বারবার ব্যর্থতার রহস্য

বার্সেলোনার বিপক্ষে ফ্রি–কিকে গোল করছেন আতলেতিকোর আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেজ। লা লিগায় তারা রীতিমতো শাসন করছে। লিগে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনা এবারও শিরোপার লড়াইয়ে বেশ এগিয়ে। অথচ যেই চ্যাম্পিয়নস লিগের সেই বিখ্যাত থিম সংটা বেজে ওঠে, বার্সেলোনার হাঁটু যেন কাঁপতে শুরু করে। লা লিগার সেই ‘দাপুটে’ বার্সেলোনা ইউরোপের মঞ্চে এসে যেন এক সাধারণ দল। কেন?

ক্যাম্প ন্যুতে আতলেতিকোর কাছে শোচনীয় হার

গত শনিবার ঘরের মাঠ ক্যাম্প ন্যুতে আতলেতিকো মাদ্রিদের কাছে ২-০ গোলের হার বার্সাকে আরও একবার খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে আরও একবার বিদায়ের শঙ্কায় তারা। অথচ এই আতলেতিকোকেই কদিন আগে লিগের ম্যাচে তাদেরই মাঠে গিয়ে ২-১ গোলে হারিয়ে এসেছিল কাতালানরা। লা লিগার সেই বাঘ চ্যাম্পিয়নস লিগে এসে কেন বিড়াল হয়ে যায়—এই গোলকধাঁধার উত্তর খুঁজছেন সমর্থকেরা।

এক দশকের হতাশাজনক পরিসংখ্যান

গত এক দশকের পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, চ্যাম্পিয়নস লিগ বার্সেলোনার জন্য যেন এক গোলকধাঁধা। ২০১৫ সালে জুভেন্টাসকে হারিয়ে সর্বশেষ যখন তারা শিরোপা জিতেছিল, মনে হয়েছিল ইউরোপে বার্সা-রাজ চলবে অনেক দিন। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভিন্ন। এরপর ১০ বার চেষ্টা করে ৫ বারই তারা কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছে। এবারও সেই পথেই হাঁটছে দল। অথচ এই ১০ বছরেই লা লিগায় বার্সেলোনা জিতেছে পাঁচটি শিরোপা, আর এবার তো ষষ্ঠ শিরোপার পথে ছুটছে তিরবেগে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পার্থক্যটা এখানেই। স্পেনের মাটিতে যারা রিয়াল মাদ্রিদকে অনায়াসেই টেক্কা দিচ্ছে, সেই রিয়ালই আবার ইউরোপের রাজা। গত ১০ বছরে রিয়াল ৫টি ইউরোপিয়ান শিরোপা জিতেছে, অথচ বার্সেলোনা সেই রিয়ালকে লিগে হারালেও চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউটে এসে খেই হারিয়ে ফেলছে। এটা কি নিছকই সামর্থ্যের অভাব, নাকি কোনো মনস্তাত্ত্বিক বাধা?

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লড়াকু মানসিকতার অভাব

লা লিগায় এই মৌসুমে হারতে থাকা ম্যাচ থেকে ২১ পয়েন্ট তুলে নিয়েছে বার্সা—যেখানে ‘কামব্যাক’ বা ঘুরে দাঁড়ানোটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অথচ চ্যাম্পিয়নস লিগে আতলেতিকোর বিপক্ষে দুই গোল খেয়ে বসার পর তাদের মধ্যে সেই লড়াকু মানসিকতা বিন্দুমাত্র দেখা যায়নি। লিগের সেই ‘রেমনতাদা’ বা ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পগুলো ইউরোপের বাতাসে মিলিয়ে গেল নিমেষেই।

২০০৫ সালের পর ক্যাম্প ন্যুতে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে কোনো জয় ছিল না আতলেতিকো মাদ্রিদের। অবশেষে সেই জয়টা তারা পেল কোথায়? চ্যাম্পিয়নস লিগে! পরিসংখ্যান বলছে, ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় আতলেতিকোর সামনে পড়লেই বার্সা খেই হারিয়ে ফেলে। ২০১৪ এবং ২০১৬ সালেও এই আতলেতিকোর কাছে হেরেই বিদায় নিতে হয়েছিল তাদের।

অভিজ্ঞতা ও ফিনিশিংয়ের সংকট

আতলেতিকোর বিপক্ষে ম্যাচে বিরতির আগেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন পাও কুবারসি। একজন কম নিয়ে খেলেও বার্সা কিন্তু ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হারায়নি। ৫৮ শতাংশ সময় বল ছিল তাদের পায়ে, শট নিয়েছিল ১৮টি। কিন্তু গোল? শূন্য। অন্যদিকে আতলেতিকো মাত্র ৩টি শট অন টার্গেট রেখে গোল আদায় করে নিয়েছে দুটি। একেই বলে ক্লিনিক্যাল ফিনিশিং।

আসল সমস্যাটা সম্ভবত অভিজ্ঞতার। মেসির সেই সোনালি প্রজন্মের কথা ভাবুন। সুয়ারেজ-নেইমার-মেসি—ভয়ংকর সেই ‘এমএসএন’ ত্রয়ীর সঙ্গে ছিলেন ইনিয়েস্তা, বুস্কেতস, জাভি ও রাকিতিচ। রক্ষণ সামলাতেন পিকে, মাচেরানো আর দানি আলভেসরা। ওই দলটার ধমনিতে ছিল চ্যাম্পিয়নস লিগের ডিএনএ।

বর্তমান বার্সেলোনা দলে রবার্ট লেভানডভস্কি ছাড়া এমন কেউ নেই, যাঁর ক্যাবিনেটে চ্যাম্পিয়নস লিগের ট্রফি আছে। হান্সি ফ্লিক কোচ হিসেবে বায়ার্নের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতলেও রাতারাতি এই তরুণদের মনে সেই জেতার তাড়না গেঁথে দেওয়া তাঁর জন্যও কঠিন। গত মৌসুমেও রক্ষণভাগের শিশুতোষ ভুলে সেমিফাইনালের স্বপ্ন ভেঙেছিল তাদের। পিএসজির কাছে ইন্টার মিলান ৫-০ গোলে হারলেও সেই ইন্টারের কাছেই হেরে বিদায় নিতে হয়েছিল বার্সাকে। দায়টা তাই নিজেদেরই।

রিয়াল মাদ্রিদের বিপরীত চিত্র

অথচ বার্সেলোনা যা পারছে না, রিয়াল মাদ্রিদ তা অবলীলায় করে দেখাচ্ছে। এটাকে কেবল ভালো খেলা বললে ভুল হবে, এটা আসলে ‘চ্যাম্পিয়ন মানসিকতা’। রিয়াল হয়তো সব সময় সেরা ফুটবল খেলে না, কিন্তু তারা জানে কীভাবে জিততে হয়। চরম চাপের মুখেও তাদের স্নায়ু ঠান্ডা থাকে, হারতে থাকা ম্যাচেও তারা বিশ্বাস হারায় না।

বার্সেলোনা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে ঘরোয়া লিগ তাদের হাতের তালুর মতো চেনা, কিন্তু ইউরোপের অচেনা সমুদ্রে তারা দিক্‌ভ্রষ্ট নাবিক। এই আভিজাত্যের লড়াইয়ে কেবল সুন্দর ফুটবল খেললে চলে না, দরকার পড়ে ইস্পাতকঠিন মানসিকতার। সেই মানসিকতা কি বর্তমান বার্সা ফিরিয়ে আনতে পারবে?

উত্তরের অপেক্ষায় বার্সেলোনা

চ্যাম্পিয়নস লিগ আর লা লিগার এই ফারাক ঘোচাতে না পারলে ইউরোপের রাতগুলো বার্সেলোনার জন্য কেবল দীর্ঘশ্বাসের গল্পই হয়ে থাকবে। শেষ পর্যন্ত ইউরোপের রাজা হওয়ার জন্য যে ‘বড় কলিজা’ লাগে, বার্সার তরুণদের মধ্যে সেই তেজটা কি আদৌ আছে? উত্তরটা হয়তো মিলবে আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে ফিরতি লেগেই।