হাতিরঝিলে সংবর্ধনা পেল সাফ চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবল দল
রাজধানীর হাতিরঝিলে সংবর্ধনা পেয়েছে সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপজয়ী বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ পুরুষ ফুটবল দল। হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছাদখোলা বাসে শোভাযাত্রার মাধ্যমে খেলোয়াড়দের নিয়ে আসা হয় হাতিরঝিলের অ্যাম্ফিথিয়েটারে। বিমানবন্দর থেকে শুরু হওয়া এই জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রা সেখানে এসে শেষ হয়, যদিও অনুষ্ঠানটি সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দলটি পৌঁছায় রাত পৌনে ১০টায়।
বিলম্বিত বরণ ও উষ্ণ অভ্যর্থনা
খেলোয়াড়েরা অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সদস্যরা তাঁদের ফুল দিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। চোটের কারণে ক্র্যাচে ভর দিয়ে মঞ্চে আসেন এক খেলোয়াড়, এরপর আসেন সাফের সেরা গোলকিপার ইসমাইল হোসেন মাহিন। একে একে সব খেলোয়াড়কে মঞ্চে ডেকে নেওয়া হয়, এবং ডেকলান সুলিভানের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের উল্লাস কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সবার শেষে মঞ্চে আসেন রোনান সুলিভান, এবং উপস্থাপক ট্রফির কথা জিজ্ঞেস করতেই সেটি এনে মঞ্চের সামনে রাখা হয়। এ সময় ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ স্লোগান ওঠে, যা পুরো পরিবেশকে উদ্দীপিত করে তোলে।
প্রধান অতিথির উপস্থিতি ও স্মৃতিচারণা
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল হক, যিনি বর্তমানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। তিনি খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন করেন এবং তাঁদের অভিনন্দন জানান। সাফের ফাইনালে গোলকিপার ইসমাইল হোসেন মাহিনের টাইব্রেকারে একটা শট সেভের কথা বলতে গিয়ে তিনি ফিরে যান ২০০৩ সালে, যখন ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে মালদ্বীপের বিপক্ষে টাইব্রেকারে তিনিও একটি শট আটকান। এছাড়া, তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন এবং ৬ এপ্রিল সরকারের পক্ষ থেকে দলকে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কৃত করার ঘোষণা দেন।
জাতীয় সংগীত ও প্রদর্শনী
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়, এরপর বিশাল পর্দায় বাংলাদেশের সাফ জয়ের রোমাঞ্চকর মুহূর্তগুলো প্রদর্শিত হয়। পরপর দুবার সাফ অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জনের পর অধিনায়ক মিঠুকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয়। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল, যিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘চেষ্টা, দেশপ্রেম আর ঐক্য থাকলে কোনো শক্তিই বাংলাদেশকে পরাজিত করতে পারবে না। আমরা এখন বলতে পারি—উই আর দ্য চ্যাম্পিয়ন। তবে এটাই শেষ নয়, কোচ মার্ক কক্সের কথামতো ২০৩৪ সালে আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে।’
কোচের লক্ষ্য ও বিশ্বকাপের স্বপ্ন
আইরিশ কোচ মার্ক কক্স সালাম দিয়ে বক্তব্য শুরু করেন এবং বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম। আমার হৃদয়ে বাংলাদেশ। ছেলেরা চেষ্টা না করলে এই ট্রফি আসত না। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ ইতিহাস গড়েছে, এই ছেলেরাও ইতিহাস গড়েছে। আমাদের এখন ২০৩৪ সৌদি আরবের বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখতে হবে।’ মালদ্বীপে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানের প্রশংসা করে তিনি এই ট্রফি সমর্থকদের উৎসর্গ করেন, যা দলের প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধ প্রকাশ করে।
আর্থিক পুরস্কারের ঘোষণা
বাফুফের সহসভাপতি নাসের শাহরিয়ার জাহেদি রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালসের পক্ষ থেকে ২৩ জন খেলোয়াড়ের প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা এবং দলের অন্য সদস্যদের ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দেন, যা আজ রাতেই সবার হাতে পৌঁছানোর কথা। এ ছাড়া, সমর্থকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। যদিও বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল আলাদা কোনো পুরস্কারের ঘোষণা দেননি, যা আগের সংবর্ধনাগুলোর মতোই একটি বিষয়।
অনুষ্ঠানের পরিবেশ ও জনসমাগম
এই সাফল্য উদযাপনে জনসাধারণের ব্যাপক অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ থাকলেও আমজনতার উপস্থিতি ছিল প্রত্যাশার তুলনায় কম; গ্যালারির তিন ভাগের এক ভাগও পূর্ণ হয়নি। তবে আয়োজন ছিল বেশ জাঁকজমকপূর্ণ, প্রবেশপথে ট্রফি জয়ের বড় বিলবোর্ড ও খেলোয়াড়দের ছবিসংবলিত বোর্ড ছিল। মঞ্চের পেছনে পর্দায় ছেলেদের সাফ জয়ের পাশাপাশি গত জানুয়ারিতে নারী ফুটসাল জয়ের ছবিও দেখানো হয়, যা অনেকের কাছে কিছুটা অসংলগ্ন মনে হয়েছে। মঞ্চের সামনে বড় অক্ষরে লেখা ছিল ‘CHAMPIONS’, এবং অত্যাধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ও আলোকোজ্জ্বল মঞ্চ পুরো পরিবেশকে বর্ণিল করে তুলেছিল।
স্পনসর প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাঁদের বক্তব্যে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে এই দলই বাংলাদেশকে এশিয়ান কাপে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি উজ্জ্বল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। সামগ্রিকভাবে, এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য একটি গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে অতীতের সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের লক্ষ্যগুলোও স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।



