ইডেন গার্ডেনে রচিত এক মহাকাব্যিক জুটির গল্প
২০০১ সালের ১৪ মার্চ, কলকাতার ইডেন গার্ডেনে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে সেরা প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখা হয়েছিল। প্রথম ইনিংসে ২৭৪ রানে পিছিয়ে পড়া ভারত ফলো অন করতে নেমে চতুর্থ উইকেট হারিয়েছিল ২৩২ রানে। কিন্তু তারপরই শুরু হয় ভিভিএস লক্ষ্মণ ও রাহুল দ্রাবিড়ের অবিশ্বাস্য এক জুটি, যা ম্যাচের রং পাল্টে দিয়ে ভারতকে অকল্পনীয় জয়ের দিকে নিয়ে যায়।
দিনের শুরু এবং লক্ষ্মণের ব্যক্তিগত সংগ্রাম
দিনের শুরুটা খুব ভালো হয়নি ভেংকট লক্ষ্মণের জন্য। সকালে পত্রিকা হাতে নিয়েই তিনি দেখলেন, শিরোনাম দখলের লড়াইয়ে তিনি পরাজিত হয়েছেন আরেক লক্ষ্মণের কাছে। বিজেপির সভাপতি বঙ্গারু লক্ষ্মণের প্রতিরক্ষা চুক্তি কেলেঙ্কারির খবর স্থানীয় পত্রিকাগুলোর আট কলাম ব্যানার হেডলাইন দখল করে নিয়েছিল, যা ভেংকট লক্ষ্মণের ব্যাটিং-বীরত্বকে নিচের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু সারা দিন মাঠে যা ঘটল, তা ছিল তার প্রতিজ্ঞার শতকরা দুশো ভাগ সফল রূপায়ণ।
অবিশ্বাস্য ব্যাটিং প্রদর্শনী
চতুর্থ দিনে লক্ষ্মণ ও দ্রাবিড় সারা দিন ব্যাটিং করে অস্ট্রেলীয় বোলারদের রীতিমতো ধাঁধায় ফেলে দেন। প্রথম ইনিংসে ১৭১ রানে অলআউট হয়ে ফলোঅন করতে নামা ভারতের পক্ষে একদিনে একটি উইকেটও না পড়া বিরল ঘটনা। বিশেষ করে যখন প্রতিপক্ষ হলো টানা ১৬টি জয়ের বিশ্ব রেকর্ডধারী স্টিভ ওয়াহর অস্ট্রেলিয়া দল। ইডেন গার্ডেন সত্যিকার বীরত্ব কাকে বলে, তা দেখালেন এই দুই ব্যাটসম্যান।
রেকর্ড ভাঙার পালা
লক্ষ্মণ ও দ্রাবিড়ের এই জুটিতে রেকর্ডের পর রেকর্ড ভাঙতে শুরু করে। লক্ষ্মণ টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের পক্ষে সর্বোচ্চ স্কোর, ভারতের মাটিতে সর্বোচ্চ টেস্ট স্কোরসহ একাধিক রেকর্ড গড়েন। অপরাজিত ২৮১ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। অন্যদিকে দ্রাবিড়, যিনি ক্রমাগত ব্যর্থতায় সমালোচনার মুখে ছিলেন, তিনি ৬ নম্বরে নামিয়ে দেওয়া হয়েও অপরাজিত ১৫৫ রানের ইনিংস খেলেন। পঞ্চম উইকেট জুটিতে তারা নতুন ভারতীয় পার্টনারশিপ গড়েন, যা টেস্ট ক্রিকেটে ভারতের পক্ষে তিন শতাধিক রানের মাত্র চতুর্থ পার্টনারশিপ।
অস্ট্রেলিয়ানদের প্রতিক্রিয়া
এই ব্যাটিং প্রদর্শনীতে অস্ট্রেলীয় দল সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়ে। কোচ বুকানন প্রথমবারের মতো প্রতিপক্ষকে চালকের আসনে বসার স্বীকৃতি দেন। অ্যাডাম গিলক্রিস্ট টেস্ট ক্রিকেটে জয় ছাড়া অন্য অনুভূতির সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে বিমূঢ় হয়ে যান। এমনকি শেন ওয়ার্ন, যিনি দ্রাবিড়কে ৮ টেস্টে ৭ বার আউট করেছিলেন, তিনি এই দিনে ১৫২ রানে মাত্র ১ উইকেট পান এবং দ্রাবিড়ের সেঞ্চুরির পর হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানান।
ম্যাচের চূড়ান্ত ফলাফল
চতুর্থ দিন শেষে ভারতের স্কোর দাঁড়ায় ৫৮৯ রান, ৪ উইকেট হারিয়ে। প্রথম ইনিংসের ২৭৪ রানের ঘাটতি কাটিয়ে তারা এগিয়ে যায় ৩১৫ রানে। ম্যাচটা এখন পুরোপুরি ভারতের হাতে। স্টিভ ওয়াহর দল, যারা সাধারণত ম্যাচের রাশ নিজেদের হাতে রাখে, তারা এবার সম্পূর্ণ পার্শ্বচরিত্রে পরিণত হয়। এই জয় শুধু একটি ম্যাচ জয়ই নয়, বরং ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য একটি ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা।



