পাতুম নিশাঙ্কার সুপারম্যানীয় পারফরম্যান্স: অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি ও অবিশ্বাস্য ক্যাচ
পাতুম নিশাঙ্কার সুপারম্যানীয় পারফরম্যান্সে শ্রীলঙ্কার জয়

পাতুম নিশাঙ্কার সুপারম্যানীয় পারফরম্যান্সে শ্রীলঙ্কার জয়

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি এক্স হ্যান্ডলে পোস্ট করা হয়েছে পাতুম নিশাঙ্কার দুটি ছবি। প্রথম ছবিতে দেখা যাচ্ছে ফিল্ডার হিসেবে উড়ন্ত ক্যাচ নেওয়ার মুহূর্ত, আর দ্বিতীয়টিতে সেঞ্চুরি করে ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে উদযাপন। আইসিসির এক্স পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘এটা কি পাখি? নাকি বিমান? নাহ, এটা পাতুম নিশাঙ্কা।’ ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি সুপারম্যান বা স্পাইডারম্যানের দ্বারস্থ না হয়ে নিশাঙ্কার গুণকীর্তন করেছে।

উইজডেনের প্রশংসা ও গ্লাডিয়েটর সিনেমার স্মৃতি

উইজডেনের এক্স হ্যান্ডলেও নিশাঙ্কার ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘আর ইউ নট এন্টারটেইনড?’ এটি অস্কারজয়ী সিনেমা ‘গ্লাডিয়েটর’-এর একটি বিখ্যাত লাইন, যেখানে নায়ক রাসেল ক্রো যুদ্ধজয়ের পর দর্শকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা কি বিনোদিত হননি?’ নিশাঙ্কার পারফরম্যান্সে উইজডেনের মনে পড়েছে সেই সিনেমাকে।

অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে ১৬তম ওভারে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ক্যাচ ছাড়ার পর ১৭তম ওভারে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ফাইটার বিমানের ‘নোজ ডাইভ’-এর মতো করে সেই একই খেলোয়াড়ের ক্যাচ ধরেন নিশাঙ্কা। পরে ব্যাটিংয়ে তিনি ৫২ বলের অপরাজিত সেঞ্চুরি করেন, যা শ্রীলঙ্কাকে অস্ট্রেলিয়ার ১৮১ রানের লক্ষ্য ১২ বল হাতে রেখে ৮ উইকেটে জয় এনে দেয়।

জীবনের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প

নিশাঙ্কার জীবনের শুরুটা সহজ ছিল না। তিনি ও তাঁর পরিবার সুনামিদুর্গতদের জন্য সরকারি বানানো ছোট্ট বাড়িতে থাকতেন। তাঁর মা কালুতারা বৌদ্ধ মন্দিরে ফুল বিক্রি করে সংসার চালাতেন। প্রাক্তন ক্রিকেটার প্রদীপ নিশান্থা নিশাঙ্কার প্রতিভা দেখে তাঁকে কলম্বো স্কুলের দলে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন। মন্দিরের সিঁড়িতে ভর্তি ফরমে সই করে নিশাঙ্কা নিজের ভবিষ্যতের দ্বার খুলেন।

কলম্বোয় থাকার খরচ মেটানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। নিশাঙ্কার বন্ধু নীলান্থা ‘জয়ারত্নে ফ্লোরিস্ট’ ফুলের দোকানের মালিককে বুঝিয়ে মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে অভিষেক টেস্ট সিরিজের জন্য নিশাঙ্কা সেই দোকান থেকে আড়াই লাখ রুপি পান, এবং কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন সেঞ্চুরি করে।

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ইতিহাস সৃষ্টি

টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নিশাঙ্কার সেঞ্চুরি শ্রীলঙ্কার জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১০ সালে মাহেলা জয়াবর্ধনের পর এই আসরে এটি শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় সেঞ্চুরি, যা ১৬ বছরের খরা কাটায়। নিশাঙ্কার মতে, এই বিশ্বকাপে ১০০ করার বড় লক্ষ্য ছিল, এবং তা পূরণ করতে পেরে তিনি আনন্দিত।

ম্যাক্সওয়েলের ক্যাচ ছাড়ার পর নিশাঙ্কা ভেবেছিলেন দলের জন্য বিশেষ কিছু করতে হবে। তিনি ম্যাক্সওয়েলকে অনুসরণ করে ক্যাচটি ধরেন, যা শুধু সৌভাগ্যের ফল নয়, বরং অনুশীলন ও দক্ষতার প্রমাণ। ব্যাটিংয়েও তাঁর মসৃণ ক্রিকেটীয় শট নির্বাচন দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের নতুন জেনারেল

নিশাঙ্কার এই সাফল্য তাঁকে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের ‘জেনারেল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করছে। কুমার সাঙ্গাকারা, মাহেলা জয়াবর্ধনে, সনাৎ জয়াসুরিয়ার মতো তারকাদের পাশাপাশি এখন নিশাঙ্কার নামও যোগ হবে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের ইতিহাসে। তাঁর মায়ের ফুল বিক্রির মতোই নিশাঙ্কা ব্যাটের সুইট স্পট থেকে শট বের করে সমর্থকদের হৃদয় জয় করেছেন।

জীবনের কঠিন সময়ে যাঁরা পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এর চেয়ে ভালো নৈবেদ্য আর কিছু হতে পারে না। পাতুম নিশাঙ্কার এই যাত্রা শুধু ক্রিকেট নয়, জীবনযুদ্ধেরও এক অনুপ্রেরণাদায়ক গল্প।