দেশে আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ হওয়ার পর অনেকের ধারণা ছিল, এবার হয়তো পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল) সম্প্রচারে বাড়তি সুবিধা পাবে দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলো। কারণ ক্রিকেটপ্রেমীরা বিকল্প হিসেবে পিএসএলের দিকেই ঝুঁকেছিলেন। তবে বাস্তব চিত্র বলছে— দর্শক পাওয়া গেলেও সেটি আইপিএলের বিকল্প হয়ে ওঠার মতো ছিল না। বরং বাজার, দর্শক আগ্রহ এবং বিজ্ঞাপন সক্ষমতার দিক থেকে আইপিএলের শূন্যতা পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আইপিএলের জায়গায় পিএসএল দেখিয়ে কি আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া গেছে? এখানে টি স্পোর্টসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের দাবি, পিএসএল দেখিয়ে কোনও লোকসান হয়নি, বরং লাভই হয়েছে। যদিও সেই লাভের অঙ্ক প্রকাশ করা হয়নি। তবে একইসঙ্গে তারা স্বীকার করেছে— আইপিএলের দর্শকসংখ্যা ও বাণিজ্যিক মূল্য স্বাভাবিকভাবেই অনেক বড়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ‘আইপিএল থেকে পিএসএলে ভিউয়ার্স স্বাভাবিকভাবে কিছুটা কমই হবে। আইপিএলে বিনিয়োগ বেশি। বিশ্বতারকাদের বড় অংশ খেলছেন। গ্লামারও আছে। তবে আমাদের পিএসএল দেখিয়ে কোনও লস নেই, লাভই হয়েছে। আর আইপিএল থেকে আগে লাভই হয়েছে। টাকার অঙ্কটা বলা যাচ্ছে না।’ যে স্বীকারোক্তি মূলত দুই টুর্নামেন্টের বাজার বাস্তবতার পার্থক্য তুলে ধরে।
আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের পটভূমি
আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধ হওয়ার পর নানামুখী নেতিবাচক খবরও প্রকাশ পেয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তের পর পরই জানা যায় যে, টি স্পোর্টস অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশে আইপিএল সম্প্রচারের চুক্তি বাতিল করেছে ভারতীয় ধনকুবের মুকেশ আম্বানির জিওহটস্টার। যদিওটি-স্পোর্টসের ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন— তাদের সঙ্গে আইপিএলের মূল স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার চুক্তি ছিল না। ফলে ‘চুক্তি বাতিল’ নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, সেটিকে বাস্তবসম্মত নয় বলেই দাবি তাদের। তবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ওটিটি স্বত্ব নিয়ে জিওহটস্টারের সঙ্গে একটি চুক্তি ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। সরকারের নিষেধাজ্ঞার পর টি স্পোর্টস সেই চুক্তি বন্ধ করতে চাইলেও, স্বত্বাধিকারী জিওহটস্টারের সেটি চালিয়ে যেতে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে তারা সরে আসে।
এ প্রসঙ্গে টি স্পোর্টসের ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘‘টি-স্পোর্টস কোনোদিনই সরাসরি আইপিএলের রাইটস কেনেনি টিভিতে খেলা দেখানোর জন্য। বরাবরই থার্ড পার্টি কোনও এজেন্সি বা কোম্পানি রাইটস কিনতো এবং তারা আমাদের স্ক্রিন ভাড়া নিয়ে খেলা দেখাতো। ওনাদের (জিওহটস্টার) সঙ্গে কখনোই আমাদের চুক্তি ছিল না। কাজেই আমাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের বাস্তবতাই নেই।’’
চুক্তি বাতিল নিয়ে তার দাবি, ‘‘স্টার বা জিও, ওরা এত বড় কোম্পানি, পাওনা থাকলে ওরা কখনোই পরের কোনও আসর আপনাকে চালাতে দেবে না। বকেয়া রাখার তাই কোনও সুযোগই নেই। আর আইসিসি ইভেন্ট বা আইপিএলের মতো বড় আসরের ক্ষেত্রে ওরা আপফ্রন্ট পুরো পেমেন্ট নিশ্চিত না করে রাইটস দেয় না। পুরোনো কোনও পাওনা তাই এখানে ইস্যু নয়। এই মৌসুমে খেলা দেখালে পুরো পেমেন্ট করতে হতো। কিন্তু আমাদের সরকারই সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে দিয়েছে, কাজেই আমাদের চুক্তি চালিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।’’
পিএসএল সম্প্রচারে সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা
অপরদিকে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ট্যাপমেডের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে পিএসএল সম্প্রচার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়নি। প্রতিষ্ঠানটির বিজনেস ডেভেলপমেন্ট নির্বাহী মমিনুল হক সাকিব জানিয়েছেন, তাদের মোট সাবস্ক্রাইবার প্রায় চার লাখ, যার মধ্যে পিএসএল চলাকালে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার দর্শক যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের ম্যাচ থাকলে দর্শক আরও বেড়েছে। মমিনুল হক সাকিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা পিএসএল দেখিয়ে সফল হয়েছি। আমাদের সাবস্ক্রাইবার হলো চার লাখ। সেখানে পিএসএল দেখানোর সময় তিন লাখ ২০ হাজার ভিউয়ার্স ছিল। এটা আমাদের জন্য অনেক। এছাড়া বাংলাদেশের খেলা সময় তো ভিউয়ার্স ছিলই। সবমিলিয়ে আমাদের কারয্ক্রম সফল বলতে পারেন।’’
এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, দেশে ক্রিকেটভিত্তিক কনটেন্টের চাহিদা এখনও শক্তিশালী। কিন্তু সেই চাহিদা আইপিএলের সমপর্যায়ে বাণিজ্যিক সাফল্যে রূপ নিতে পেরেছে কিনা, সেটিই বড় প্রশ্ন।
এ প্রসঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি টেলিকম কোম্পানির ঊধ্বর্তন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়েছে বাংলা ট্রিবিউনের। যাদের অ্যাপ থেকে আইপিএল, কিংবা পিএসএল দেখার জন্য বিভিন্ন প্যাক কেনার সুযোগ থাকে। তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘‘আসলে এক্ষেত্রে লোকসান হয়তো হচ্ছে না। কিন্তু রাজস্ব কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা গ্রাহকদের সেটা দেখাতে পারছি না। তবে এসবক্ষেত্রে সেগমেন্ট অনুসারে তথ্য রাখা হয় না। কোম্পানি সার্কিবভাবে তথ্য সংগ্রহ করে থাকে।’’
বাস্তবতা হলো, আইপিএল কেবল একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট নয়— এটি বৈশ্বিক ক্রীড়া-বিনোদন পণ্য। বিপুল ফ্র্যাঞ্চাইজি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক তারকাদের উপস্থিতি এবং শক্তিশালী বিপণন আইপিএলকে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রিকেট ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে। ফলে দর্শকের একটি অংশ বিকল্প হিসেবে পিএসএল দেখলেও, বিজ্ঞাপনদাতা ও সম্প্রচার বাজারে আইপিএলের মূল্য এখনও আলাদা।
তাই সামগ্রিক বিশ্লেষণে বলা যায়, দেশে আইপিএল নিষিদ্ধ হওয়ায় পিএসএল সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো একেবারে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বরং বিকল্প কনটেন্ট হিসেবে তারা উল্লেখযোগ্য দর্শক পেয়েছে এবং সীমিত পরিসরে আর্থিক সুবিধাও অর্জন করেছে। কিন্তু এটাও স্পষ্ট, পিএসএল এখনও আইপিএলের বাজারমূল্য, দর্শক আগ্রহ এবং বাণিজ্যিক প্রভাবের সমতুল্য হয়ে উঠতে পারেনি। অর্থাৎ ক্ষতি পুরোপুরি না হলেও, আইপিএলের অনুপস্থিতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পিএসএল দিয়ে পূরণ হয়নি।



