গত বৃহস্পতিবার থেকে টানা ভূমিকম্প, মৌসুমি বৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জাপান। গত ১০০ বছরের মধ্যে ইয়ামানাশি জেলায় এত শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হয়নি বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া কর্মকর্তারা। ভূমিকম্পের পর ইয়ামানাশিসহ সাইতামা ও ইবারাকি জেলার প্রায় তিন হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটে এবং কোথাও কোথাও পানি সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
শক্তিশালী ভূমিকম্পের ধারাবাহিকতা
গত বৃহস্পতিবার সকালে উত্তর জাপানের ইওয়াতে জেলায় ৭ দশমিক ২ মাত্রার বড় ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর পরের দিন শুক্রবার টোকিওর পাশের দুই জেলায় শক্তিশালী দুটি কম্পন অনুভূত হয়। বেলা একটার দিকে চিবা জেলায় ৫ দশমিক ৮ মাত্রার একটি ভূমিকম্প আঘাত হানে, যার উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ৫০ কিলোমিটার গভীরে। টোকিওর কেন্দ্রস্থলসহ আশপাশের জেলা কেঁপে ওঠে। রাত সাড়ে ১০টার দিকে মুঠোফোনে ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা বাজতে শুরু করে। এর কয়েক সেকেন্ড পরেই টোকিওসহ আশপাশের এলাকার ভবনগুলো আবারও দুলে ওঠে। জাপানের আবহাওয়া এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, টোকিওর পশ্চিমে ইয়ামানাশি জেলায় আঘাত হানা এই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৬ এবং কেন্দ্রস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ২০ কিলোমিটার গভীরে।
ভূমিকম্পের প্রভাব ও উদ্ধার অভিযান
ভূমিকম্পে বিভিন্ন স্থানে ভবন বা দেয়াল ধসে পড়ার মতো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। তবে কোনো সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়নি। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে এসব ভূমিকম্পের মধ্যে পারস্পরিক কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া কর্মকর্তারা। কানাগাওয়া জেলায় ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। গত রাত পর্যন্ত অন্তত ছয়জনকে হাসপাতালে নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ইয়ামানাশির পাশের শিজুওকা জেলায় অবস্থিত হামাওকা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তেজস্ক্রিয়তা পরিমাপক যন্ত্রগুলোতে কোনো অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হয়নি। ভূমিকম্পের কারণে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চারটি এক্সপ্রেসওয়ের কিছু অংশ বন্ধ রাখা হয়েছিল। টোকিও ও নাগোইয়া শহরের মধ্যেও তোকাইদো শিনকানসেন বুলেট ট্রেন পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়। তবে রাত একটার পর এগুলো আবার চালু হয়।
ফুজি পর্বতমালার সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ
আবহাওয়া কর্মকর্তাদের ভাষ্যানুযায়ী, গত ১০০ বছরের মধ্যে এই প্রথম ইয়ামানাশি জেলায় এত শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হলো। ইয়ামানাশি জেলায় ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বড় দুশ্চিন্তা হচ্ছে এর এক প্রান্তে জাপানের সবচেয়ে উঁচু ফুজি পর্বতমালার অবস্থান। এটি একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। গত রাতের ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল এই পর্বত থেকে মাত্র প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, পর্বতের ভেতরে বড় কোনো পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে অগ্ন্যুৎপাতের কোনো আশঙ্কা করা হচ্ছে না। এই পর্বতের অগ্ন্যুৎপাত টোকিও শহর পর্যন্ত অচল করে দিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ও টাস্কফোর্স গঠন
অবস্থার গুরুত্ব বিবেচনায় শুক্রবার রাতেই গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে। ভূমিকম্প পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় রেখে কাজ করার কথা জানিয়ে তাকাইচি বলেন, ‘মানুষের জীবন রক্ষা আমাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
প্রবল বৃষ্টিপাত ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব
একটি স্থির মৌসুমি বৃষ্টিবলয়ের কারণে কয়েক দিন ধরেই জাপানে বৃষ্টি হচ্ছে। আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার সকালের মধ্যে নাগাসাকি জেলার গোতো এলাকায় মোট ৬০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ ছাড়া কুমামোতো ও সাগা জেলায়ও ৫০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকাল ৭টা পর্যন্ত বৃষ্টির কারণে ১৩টি জেলার ২০ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জোড়া ঘূর্ণিঝড়ের আগমন
ভূমিকম্প ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতই শুধু নয়, জাপান এখন পরপর ধেয়ে আসা দুই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়েরও মুখোমুখি। এর প্রভাবে দেশের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টি আরও প্রবল হচ্ছে। আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার খবর অনুযায়ী, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় ‘হিগোস’ টোকিওর অদূরের চিবা জেলা ঘেঁষে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এর ফলে উপকূলীয় চোশি শহরে ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ মিলিমিটারের রেকর্ড বৃষ্টি হয়েছে। টানা বর্ষণে ইয়ামাগুচি জেলায় ভূমিধসে একজন নিখোঁজ হওয়ার কথা জানিয়েছে জাপানের গণমাধ্যম। হিয়োগো জেলায় শুক্রবার নদীতে এক ব্যক্তির মৃতদেহ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া গত রাতে ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থলের পাশের শিজুওকা ও কানাগাওয়া জেলার কিছু এলাকায়ও ভূমিধসের জন্য চার স্তরের সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এদিকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় ‘মেক্কালা’ আজ সকালে কিউশু উপকূলের অদূরে অবস্থান করছিল। এটি আগামীকাল রোববারের মধ্যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূল ধরে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে স্থলভাগের আরও কাছাকাছি চলে আসতে পারে। এতে আবহাওয়ার আরও অবনতি ঘটতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে, আবহাওয়া সংস্থা প্রবল বাতাস, ভূমিধস, উঁচু ঢেউ এবং নিচু এলাকায় বন্যার ব্যাপারে জনসাধারণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছে।



