পার্বত্য চট্টগ্রামের বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক: নববর্ষ উৎসবের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা
পার্বত্য চট্টগ্রামের বিজু-সাংগ্রাই উৎসব: সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক বার্তা

পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ উৎসব: বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসুকের সাংস্কৃতিক মহিমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে বসবাসরত মারমা, রাখাইন ও চাকমা সম্প্রদায়ের জন্য এপ্রিল মাস বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এই সময়ে তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী নববর্ষ উৎসব বিজু, সাংগ্রাই, বৈসুক, বিষু ও বিহু মেলা উদযাপন করে। রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে রাখাইন তরুণীদের নাচ এই উৎসবের একটি আকর্ষণীয় দিক।

সাংগ্রাই: মারমা ও রাখাইনদের নববর্ষ উৎসব

সাংগ্রাই মারমা ও রাখাইন সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, যা সাধারণত এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে উদযাপিত হয়। এটি পুরোনো বছর থেকে নতুন বছরে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। এই উদযাপন সাধারণত চার থেকে পাঁচ দিন স্থায়ী হয় এবং নববর্ষের দিনে এর সমাপ্তি ঘটে।

সাংগ্রাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো প্রতীকীভাবে মৈত্রী পানিবর্ষণ, যা পূর্ববর্তী বছরের পাপ ও দুর্ভাগ্য ধুয়ে ফেলার প্রতীক। শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীরা জলক্রীড়া ও মৈত্রী পানিবর্ষণে অংশ নিয়ে উৎসবের আমেজকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিভিন্ন নামে নববর্ষ উদযাপন

এই নববর্ষ উৎসব বিভিন্ন নামে উদযাপিত হয়, যেমন সাংগ্রাইন, বিজু, বৈসু, চাংক্রান, সাংরান, বিষু প্রভৃতি, যা বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে প্রচলিত। বাংলা পঞ্জিকায় এই সময়টিকে মহাবিষুবসংক্রান্তি নামে উল্লেখ করা হয়। যদিও ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও ঐতিহ্যে ভিন্ন ভিন্ন নামে উৎসবটি প্রচলিত, এসব উৎসবের একটি অভিন্ন সাংস্কৃতিক শিকড় রয়েছে, যা ‘বিষুবসংক্রান্তি’ থেকে উদ্ভূত বলে বিশ্বাস করা হয়, যা ঋতুর পরিবর্তন ও জীবনের নবায়নের প্রতীক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে মিল

নববর্ষ উৎসবটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন উৎসবের সঙ্গে একই সময়ে উদযাপিত হয়। যেমন লাওসে পি মাই, থাইল্যান্ডে সংক্রান এবং কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান ও শ্রীলঙ্কায় আলুত আভুরুদু নববর্ষ উৎসব। এ ছাড়া এ সময়েই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বৈশাখী (পাঞ্জাব), পুথান্ডু (তামিলনাড়ু), বিশু (কেরালা), উগাদি (অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটক) ও বিহু (আসাম) উদযাপিত হয়।

এবছরের সাংগ্রাই উদযাপন

এ বছর সাংগ্রাই ১৩ থেকে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত উদযাপিত হবে এবং নতুন বছর শুরু হবে ১৭ এপ্রিল (মারমা ও রাখাইন বর্ষ ১৩৮৮)। মন্দির, রাস্তা ও জনসমাগমস্থলে মানুষ প্রার্থনা ও মৈত্রী পানিবর্ষণের মাধ্যমে উৎসবটি উদযাপন করে থাকে। তবে এই বর্ষবরণের উৎসব শুধু একটি উৎসব নয়। এটি একটি মহাজাগতিক পৌরাণিক কাহিনির সঙ্গে যুক্ত। এটি পরিবর্তন, শৃঙ্খলা ও ক্ষমতাকাঠামো সম্পর্কে এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধিকে তুলে ধরে।

পৌরাণিক কাহিনি ও তার তাৎপর্য

একটি পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, বর্তমান মহাজাগতিক চক্রের প্রারম্ভিক পর্যায়ে জ্যোতির্ময় সত্তাগণ ব্রহ্মলোক থেকে মানবজগতে অবতরণ করে। তাদের প্রাথমিক দৈহিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও দীপ্তিময়। পরবর্তী সময়ে পৃথিবীর উপরিভাগে থাকা ‘অমৃতসদৃশ’ আস্তরণকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করার ফলে তারা ধীরে ধীরে স্থূল দেহ ধারণ করে এবং দেহধারণের ফলে তাদের স্বাভাবিক জ্যোতি ক্রমে ম্লান হয়ে যায়।

পৌরাণিক বিবরণ অনুসারে, এই মহাবিশ্ব স্থির বা অচল নয়, এটি প্রতিনিয়ত সংকোচন ও পুনরায় বিস্তৃতির মাধ্যমে ক্রমাগত পরিবর্তিত হয় এবং প্রয়োজনের ভিত্তিতে এটি একটি ক্রমবিকাশমান ও বিবর্তনশীল সত্তা। দিব্য সত্তাগণ, বিশেষত দেবরাজ ইন্দ্র—মানবজগতের আচরণ ও গতিপ্রকৃতিকে সময়ে সময়ে প্রভাবিত করেন বলে বিশ্বাস করা হয়।

ক্ষমতার সংক্রমণ ও রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা

সাংগ্রাইয়ের পৌরাণিক কাহিনি একধরনের বিকল্প নীতির ইঙ্গিত দেয়: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনো স্থির ও অপরিবর্তনীয় ক্ষমতাকাঠামো থেকে জন্ম নেয় না; বরং তা নিশ্চিত হয় ক্ষমতার নিয়মিত সঞ্চালন ও সংক্রান্তি বা সংক্রমণের মাধ্যমে। যে ব্যবস্থায় পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন, ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস ও নবায়নের প্রক্রিয়া বিদ্যমান থাকে, সেই কাঠামোগুলোই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ঝুঁকি বা সংকট মোকাবিলায় অধিক সক্ষম হয়ে ওঠে।

সমকালীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পৌরাণিক কাহিনির এই শিক্ষা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। পর্যবেক্ষকদের মতে, এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে প্রায়ই একটি অস্থায়ী দায়িত্ব হিসেবে নয়; বরং স্থায়ীভাবে দখল করে রাখার একটি প্রপঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা দেখা গেছে। সামরিক ও গণতান্ত্রিক—উভয় ধাঁচের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক শক্তিই বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীভূত ও কুক্ষিগত করার প্রবণতা প্রদর্শন করেছে।

উপসংহার

সাংগ্রাইয়ের পৌরাণিক কাহিনির শিক্ষা ও বর্ষবরণের আচার-অনুষ্ঠান এই গভীর দার্শনিক বোধকেই যেন প্রতীকী অর্থে ধারণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এই উৎসব কেবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে, যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।