চট্টগ্রামে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনে শ্রদ্ধা-ভালোবাসার বন্যা
চট্টগ্রামে শহীদ দিবস পালনে শ্রদ্ধার্ঘ্য ও শপথ

চট্টগ্রামে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনে শ্রদ্ধা-ভালোবাসার বন্যা

গভীর শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা আর অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম শহর ও জেলায় পালিত হয়েছে শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০২৬। শনিবার ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের পদচারণায় মুখরিত ছিল নতুন নির্মিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। ইতিহাসের ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের স্মৃতির প্রতি জানানো হয়েছে ফুলেল শ্রদ্ধাঞ্জলি।

সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ

সরকারি অফিস, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী গ্রুপ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ এই দিবস পালনে অংশ নিয়ে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার। হাজার হাজার মানুষ পায়ে হেঁটে নতুন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হয়েছেন ফুল ও মালা নিয়ে।

ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় তারা সমস্বরে গেয়েছেন সেই অমর গান: "আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি"। এই সুরে সুরে মিশে গেছে পুরো শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ।

জেলা প্রশাসনের আয়োজিত কর্মসূচি

জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়েছে নানা ধরনের কর্মসূচি:

  • শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ
  • সরকারি ও বেসরকারি ভবনে অর্ধনমিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন
  • আলোচনা সভা ও সেমিনার
  • কোরআন তিলাওয়াত ও বিশেষ প্রার্থনা
  • স্কুলছাত্রদের জন্য রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা

দিবসের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হয় রাত বারোটার এক মিনিট পর, যখন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদীতে প্রথম পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর ভাষা শহীদদের স্মৃতির প্রতি এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

গণ্যমান্য ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদন

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান ও ইয়ারশেদ উল্লাহসহ বিভিন্ন গণ্যমান্য ব্যক্তি শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন:

  1. চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন
  2. চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ
  3. চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার
  4. চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া
  5. চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম
  6. চট্টগ্রাম শহরের উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিটের জেলা পুলিশ সুপার

রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের অংশগ্রহণ

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনও শহীদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:

  • চট্টগ্রাম সিটি বিএনপি
  • উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি জেলা ইউনিট
  • জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল
  • যুবদল
  • বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন
  • চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব
  • চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন
  • চট্টগ্রাম জেলা বার অ্যাসোসিয়েশন

দিবসের শুরুতেই চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি স্মার্ট কন্টিনজেন্ট শহীদ মিনারে গার্ড অব অনার প্রদান করে, যা দিবস পালনে বিশেষ মাত্রা যোগ করে।

শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ

সকালবেলা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিক্ষার্থীরা রঙিন ব্যানার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে শহীদ মিনারে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যগণ各自 বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ প্রার্থনা

জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে ভাষা শহীদদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। এসব প্রার্থনায় শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য দোয়া চাওয়া হয়, যা দিবস পালনে ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

পুরো দিনজুড়ে চট্টগ্রামবাসী দেখিয়েছেন কিভাবে ভাষা আন্দোলনের চেতনা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও প্রেরণাদায়ক। শহীদ দিবস পালনের এই ব্যাপক আয়োজন প্রমাণ করে যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা চট্টগ্রামবাসীর হৃদয়ে চিরজাগরুক রয়েছে।