ঠাকুরগাঁওয়ে ব্যতিক্রমী বট ও পাকুড়গাছের বিয়ে, সনাতন রীতিতে সম্পন্ন হলো অনুষ্ঠান
ঠাকুরগাঁওয়ে বট ও পাকুড়গাছের বিয়ে, সনাতন রীতিতে অনুষ্ঠান

ঠাকুরগাঁওয়ে ব্যতিক্রমী বট ও পাকুড়গাছের বিয়ে সম্পন্ন

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নের কিসমত পাহাড়ভাঙ্গা গ্রামে আজ শুক্রবার একটি অনন্য বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। মানুষের নয়, বট ও পাকুড়গাছের মধ্যে এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা সনাতন ধর্মীয় রীতিতে পালন করা হয়েছে। বটগাছকে কনে এবং পাকুড়গাছকে বর হিসেবে সাজানো হয়েছিল, আর এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠান দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষের ঢল নামে।

বিয়ের আয়োজনের পেছনের উদ্দেশ্য

আয়োজকেরা জানান, এই বিয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃতি ও ব্যক্তির মঙ্গল কামনা করা। বিয়ের বেশির ভাগ ব্যয় বহন করেছেন বর-কনের অভিভাবকরা, যেখানে পরিমল চন্দ্র বর্মন ও বলরাম সরকার যথাক্রমে কনেপক্ষ ও বরপক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। পুরোহিত শুভন চক্রবর্তী বলেন, "বট ও পাকুড় হিন্দুশাস্ত্রে দেবতা বৃক্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়, এবং পূজাতেও এই গাছগুলো ব্যবহার করা হয়। ব্যক্তির মোক্ষলাভ ও প্রকৃতি বিনাশের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এই বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে।"

বিয়ের অনুষ্ঠানের বিবরণ

বিয়ের আয়োজন শুরু হয় গতকাল বৃহস্পতিবার গায়েহলুদ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। আজ শুক্রবার দুপুরে মূল অনুষ্ঠানে দেখা যায়, কালীমন্দিরের পাশের পুকুরপাড়ে অবস্থিত পাকুড়গাছকে সাদা ধুতি এবং বটগাছকে লাল-হলুদ শাড়ি পরানো হয়েছে, সঙ্গে ফুলের মালা শোভা পাচ্ছে। বিয়ের মণ্ডপে আলপনা আঁকা হয়েছে, যেখানে ধান, দুর্বা, হলুদ, সিঁদুর, ধূপকাঠি, কলা, দই ও সন্দেশসহ বিভিন্ন মিষ্টান্ন রাখা হয়েছে।

  • বর-কনের অভিভাবকদের বেদির সামনে বসানো হয়েছিল।
  • পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে উলুধ্বনি ও সানাই-ঢাকঢোলের সুর বাজছিল।
  • বেলা আড়াইটার দিকে সাত পাকে বর-কনে বাঁধা পড়েন এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা উপহার দিয়ে আশীর্বাদ করেন।

বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার পর মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়, যেখানে প্রায় ৪০০ পরিবারকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল।

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও গুরুত্ব

ব্যতিক্রমী এই বিয়ে দেখতে আশপাশের গ্রাম থেকেও অনেকে ছুটে এসেছিলেন। চিলারং ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য রেজাউল ইসলাম বলেন, "বট-পাকুড়ের বিয়ের কথা শুনে কৌতূহলী হয়ে এসেছি, এবং এটি প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার একটি অনন্য উদাহরণ।" প্রবীণ শিক্ষাবিদ মনতোষ কুমার দে যোগ করেন, "এটি একটি লোকাচার, যা পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা ছড়ায়। বট ও পাকুড়গাছ প্রকৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে, এবং এই বিয়ে মানুষকে বৃক্ষপ্রেমী করে তোলার চেষ্টা।"

পরিমল চন্দ্র বর্মন জানান, চার বছর আগে বট ও তিন বছর আগে পাকুড়গাছ লাগানো হয়েছিল, এবং প্রবীণদের পরামর্শে তিনি এই বিয়ের আয়োজন করেছেন। বলরাম সরকার বলেন, "পরিবারের বড়দের নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিয়ে দিচ্ছি, এবং উৎসবে কোনো কমতি রাখা হয়নি।" এই অনুষ্ঠানটি ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রকৃতি সংরক্ষণ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।