বৃহস্পতিবার বিকেলে কুমারখালীর শিলাইদহ ইউনিয়নের কসবা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা রবিউল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন ঘিরে স্বাধীনতার পর থেকেই দেখে আসছি কুঠিবাড়ির মেলা। মেলার কয়েকদিন আগে থেকেই মেয়ে-জামাই, আত্মীয়স্বজনরা শিলাইদহে ভিড় করতেন। এখন আর সেই মেলা নাই। তারপরে এবার নাকি একেবারেই হচ্ছে না মেলা। দোকানদার সব চলে যাচ্ছে।’ কুঠিবাড়ির পেছনে তাঁর মুদিখানার ব্যবসা আছে।
মেলা বন্ধের ঘটনা
জানা গেছে, ২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়। গত বছরও জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে কুঠিবাড়ির সামনের আমবাগানে বসেছিল গ্রামীণ মেলা। ২৫ বৈশাখের আগেই এবারও দূরদূরান্ত থেকে এসেছিলেন হরেক রকম পণ্যের ব্যবসায়ীরা। তবে অজানা কারণে এবার মেলা হচ্ছে না। সে জন্য দোকানপাট গুছিয়ে দুঃখভরা মন নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে।
ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ
মাদারীপুর থেকে প্রায় ২০ বছর ধরে কুঠিবাড়ির মেলায় আসছেন মো. আনোয়ার হোসেন (৪৭)। তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। টাকা-পয়সা খরচ করে আমরা আসছি। মেলার নাকি অনুমতি নেই। এখন সবাই চলে যাচ্ছি। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। সামনের বছর থেকে আর এই মেলায় আসব না।’ শরীয়তপুর থেকে আসা খেলনা ব্যবসায়ী মীর বাবুল (৫৫) বলেন, ‘১৫ বছর ধরে কুঠিবাড়ির মেলায় ব্যবসা করে আসছি। এবারও দুই দিন আগে এসে কুঠিবাড়ির দেয়ালঘেঁষে দোকান দিয়েছিলাম। কিন্তু বুধবার বিকেলে প্রশাসনের লোকজন এক ঘণ্টার মধ্যে দোকান ভেঙে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। গতকাল বৃষ্টি ছিল। তাই এখন দুঃখভরা মন নিয়ে চলে যাচ্ছি।’
তাঁর ভাষ্য, প্রায় শতাধিক ব্যবসায়ী দোকান বসিয়েছিলেন। ভেঙে চলে যাওয়ায় প্রত্যেকের পাঁচ থেকে ১০ হাজার টাকা করে লোকসান হয়েছে।
‘প্রতিবছরই কুঠিবাড়ির মেলা করি। কিন্তু এবার এসে এভাবে ভাঙা মন নিয়ে চলে যাব, তা কল্পনাও করিনি।’ আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন শরীয়তপুর জেলার দরিয়া থানা থেকে আসা আব্দুস সাত্তার ব্যাপারী। তিনি বলেন, ‘সবাই দুঃখভরা মন নিয়ে চলে যাচ্ছি। অনেকগুলো টাকা লোকসান হয়ে গেল। সামনের বছর থেকে আর আসব না। কুঠিবাড়ি মেলার ঐতিহ্য এবারই হারিয়ে গেল।’
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
শিলাইদহ গ্রামের ৭২ বছর বয়সী আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘দেশ স্বাধীনের পর থেকে দেখছি কুঠিবাড়ির মেলা। কোনো বছরই ঐতিহ্যবাহী মেলা মিস যায়নি। তবে এবার যে কী কারণে মেলা হচ্ছে না, তা জানা নেই। তবে যেকোনোভাবেই হোক ঐতিহ্যবাহী কুঠিবাড়ির গ্রামীণ মেলা টিকিয়ে রাখতে হবে।’
প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জাকির হোসেন মুঠোফোনে বলেন, ‘কবিগুরুর জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। তবে প্রস্তুতি সভায় সিদ্ধান্ত না হওয়ায় এবার মেলা হচ্ছে না। এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।’



