মিশরের প্রাণকেন্দ্র কায়রোর বুকে, মদিনাতুল বুঊসের মাঠে এক অনন্য আবহে উদযাপিত হলো বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। শনিবার (২৫ এপ্রিল) প্রবাসের এই প্রান্তর যেন হঠাৎই রূপ নিল এক টুকরো বাংলাদেশে, যেখানে স্মৃতি, সংস্কৃতি আর আবেগ মিলে তৈরি করল এক বর্ণিল সাংস্কৃতিক মঞ্চ।
উদ্বোধন ও অতিথিবৃন্দ
নববর্ষ উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে এই উৎসবের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মারকাজুত তাতবীরের প্রধান ও শাইখুল আজহারের উপদেষ্টা ড. নাহলা সাইদী এবং মদিনাতুল বুউসের প্রধান ড. আহমদ ইসাম আল-কাদি।
আয়োজক দল
মিশরে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈশাখী উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না, এটি ছিল শিকড়ে ফেরার এক গভীর আকাঙ্ক্ষা, পরিচয়ের পুনরাবিষ্কার এবং প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত প্রতিরোধ। আয়োজনের পেছনে নিরলস শ্রম দিয়েছেন আহ্বায়ক মিনহাজুল আবেদীন সামি, যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ মিরাজুর রহমান ও সদস্য সচিব সালেহ আহমেদ। সঞ্চালনায় আব্দুল্লাহ আল মারুফ অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তোলেন, আর মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দেন লেখক ও কলামিস্ট জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান, সঙ্গে ছিলেন জিয়া উল্লাহ রিফায়ি।
ঐতিহ্যের প্রদর্শনী
উৎসবের পরতে পরতে ছিল বাঙালির ঐতিহ্যের উজ্জ্বল প্রকাশ। খাবারের স্টলগুলো যেন হয়ে উঠেছিল স্মৃতির ভাণ্ডার—পুচকা, চটপটি, হালিম, বিরিয়ানি, মাছের মালাইকারি, পিঠা-পুলি, চিতই পিঠা, পাটিসাপটা, পুলি পিঠা আর মিষ্টান্নের রঙিন সম্ভার। প্রতিটি স্বাদ যেন প্রবাসীদের মনে ফিরিয়ে দিচ্ছিল গ্রামের উঠোন, শৈশবের উৎসব আর মায়ের হাতের রান্নার অমলিন স্মৃতি।
খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক পর্ব
শুধু খাবারেই সীমাবদ্ধ ছিল না আয়োজন; খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল উচ্ছ্বাসের বিস্তার। হাড়িভাঙা, চেয়ার খেলা, ক্রিকেট ও ফুটবল—সব মিলিয়ে এক প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি হয়। শিশুদের জন্য আলাদা আয়োজন উৎসবকে করে তোলে আরও সমৃদ্ধ। বৈশাখী গানের সুরে, হাসির কলরবে আর মানুষের মিলনে প্রবাসের দূরত্ব যেন বিলীন হয়ে যায় মুহূর্তেই। বিজয়ীদের হাতে কাপ ও ট্রফি তুলে দিয়ে আনন্দের পরিসমাপ্তি ঘটে গৌরবের আবহে।
অংশগ্রহণকারীরা
এই মিলনমেলায় অংশ নেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় এবং আইন শামস বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা, পাশাপাশি বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত প্রবাসী বাঙালিরা। তাদের উপস্থিতিতে উৎসব পায় এক সার্বজনীন রূপ, যেখানে পরিচয় একটাই—বাঙালি।
রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য
অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সামিনা নাজ—একজন কূটনীতিকের গণ্ডি ছাড়িয়ে যিনি হয়ে উঠেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের এক আবেগঘন আশ্রয়স্থল। তার উপস্থিতি যেন উৎসবকে দিয়েছে এক অনন্য মর্যাদা ও উষ্ণতা। বক্তব্যে তিনি শুধু আনুষ্ঠানিক ভাষণ দেননি, বরং হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারণ করেছেন বাঙালিত্বের গর্ব ও দায়বদ্ধতার কথা। তিনি বলেন, 'আমরা যেখানেই থাকি, আমাদের শিকড় আমাদের পরিচয়। সেই পরিচয়কে ধারণ করাই আমাদের দায়িত্ব।' তার কণ্ঠে উঠে আসে ইতিহাসের ধ্বনি—মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে ১৫৮৪ সালে বঙ্গাব্দ প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে যে বৈশাখের সূচনা, তা আজও বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। তিনি প্রবাসীদের উদ্দেশে আরও বলেন, 'বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরার দায়িত্ব এখন আপনাদের কাঁধে।'
বিশেষ অতিথিদের বক্তব্য
বিশেষ অতিথি ড. আহমদ ইসাম আল-কাদি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের এমন উদ্যোগের প্রশংসা করে বলেন, 'সংস্কৃতি মানুষকে তার শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে, আর এই আয়োজন সেই বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছে।' তিনি ড. আহমদ আত-তায়্যেবের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার কথাও তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশের জন্য দোয়া করেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ড. আহমেদ রমজান, যিনি এই আয়োজনকে প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করেন।
উপসংহার
প্রবাসের মাটিতে এই বৈশাখী উৎসব তাই কেবল একটি দিনব্যাপী অনুষ্ঠান নয়, এটি ছিল এক সাংস্কৃতিক জাগরণ, এক আবেগঘন মিলন, এক আত্মপরিচয়ের পুনর্লিখন। কায়রোর আকাশে সেদিন যে রঙ ছড়িয়ে পড়েছিল, তা শুধু উৎসবের নয়, তা ছিল ভালোবাসার, শিকড়ের আর অবিচ্ছিন্ন বাঙালিত্বের প্রতিচ্ছবি।



