দিনাজপুরে ঐতিহাসিক ঈদগাহ মাঠে লাখো মুসল্লির ঈদের জামাত
দিনাজপুরে ঐতিহাসিক ঈদগাহ মাঠে লাখো মুসল্লির জামাত

রাতভর ঝড়-বৃষ্টির পর সকালেও ছিল বৈরী আবহাওয়া। তবুও সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ শহীদ বড় ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঈদের বৃহৎ জামাত। আয়তনের দিক থেকে এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম এই ঈদগাহ ময়দানে লাখো মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করেন।

ঈদের জামাতে ইমামতি

সকাল ৯টায় ঈদের জামাতে ইমামতি করেন মাওলানা মতিউর রহমান কাসেমী। জামাতে অংশ নেন দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ৫২ গম্বুজবিশিষ্ট ঈদগাহ মিনারের সামনে প্রায় ২২ একর আয়তনের বিশাল মাঠে নামাজ শেষে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

মুসল্লিদের উপস্থিতি

বড় এই জামাতে অংশ নিতে দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ভোর থেকেই মুসল্লিরা মাঠে আসতে থাকেন। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নামাজ আদায় করতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন তারা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা

ঈদের জামাতকে ঘিরে কয়েকদিন ধরেই নেওয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। পুরো মাঠ রোলার দিয়ে সমান করা হয় এবং সবুজ ঘাসের ওপর চুন দিয়ে কাতারের দাগ টানা হয়। মুসল্লিদের ওজু, পরিচ্ছন্নতা ও নির্বিঘ্ন প্রবেশ নিশ্চিত করতে নেওয়া হয় বিশেষ ব্যবস্থা। মাঠের চারপাশে তৈরি করা হয় ২০টি প্রবেশদ্বার।

নিরাপত্তা জোরদারে স্থাপন করা হয় তিনটি ওয়াচ টাওয়ার। সেখান থেকে পুরো এলাকা পর্যবেক্ষণ করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। মাঠে প্রবেশের আগে মুসল্লিদের মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে তল্লাশি করা হয়। পুরো ঈদগাহ এলাকা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রাখা হয়।

মাঠ ও আশপাশের এলাকায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব, আনসার এবং স্বেচ্ছাসেবকরা দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিটি কাতারে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্য ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান ছিল। এছাড়া ইমামের খুতবা ও নামাজের শব্দ সবার কাছে পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা হয় প্রায় ১০০টি মাইক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মুসল্লিদের অনুভূতি

উপশহর এলাকার মুসল্লি সোহেল রানা বলেন, “এত বড় জামাতে নামাজ পড়তে পেরে গর্ববোধ করি। হাজারো মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে নামাজ আদায়ের অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম।”

দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আখতারুজ্জামান জুয়েল বলেন, “লাখ লাখ মুসল্লির সঙ্গে একসঙ্গে দোয়া করার মধ্যে আলাদা এক আবেগ কাজ করে। আল্লাহ নিশ্চয়ই কারও না কারও দোয়া কবুল করবেন—এই বিশ্বাস থেকেই আমরা এখানে আসি।”

ঈদগাহ আবাসিক এলাকার নাঈম হাসান বলেন, “শৈশব থেকেই এই মাঠে নামাজ আদায় করছি। সময়ের সঙ্গে মাঠ আরও বড় ও সুন্দর হয়েছে। এটি আমাদের গর্ব।”

কাপাসিয়া থেকে আসা সিরাজুল ইসলাম বলেন, “শুনেছিলাম এখানে লাখো মানুষের সমাগম হয়। সেই ইচ্ছা থেকেই এসেছি। এত বড় জামাতে নামাজ আদায় করে খুব ভালো লাগছে।”

বগুড়ার গাবতলী থেকে আসা জাবেদ আলী বলেন, “আগেও এখানে নামাজ পড়েছি। বড় জামাতে নামাজ আদায়ের আলাদা প্রশান্তি আছে।”

সংসদ সদস্যের বক্তব্য

দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “খুব শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদের জামাত সম্পন্ন হয়েছে। মুসল্লিদের জন্য সব ধরনের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছিল।”

ঈদগাহ মাঠের বৈশিষ্ট্য

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গোর-এ শহীদ বড় ময়দানের আয়তন প্রায় ২২ একর। ২০১৭ সালে নির্মিত ৫২ গম্বুজবিশিষ্ট ঈদগাহ মিনার নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই ঈদগাহ মিনারে রয়েছে ৫০টি গম্বুজ ও দুই পাশে ৬০ ফুট উচ্চতার দুটি মিনার। মাঝখানে রয়েছে আরও দুটি ৫০ ফুট উচ্চতার মিনার। ঈদগাহ মাঠের মিনারের প্রথম গম্বুজ অর্থাৎ মেহেরাব (যেখানে ইমাম দাড়াবেন) তার উচ্চতা ৪৭ ফিট। এর সাথে রয়েছে আরও ৪৯টি গম্বুজ। এছাড়া ৫১৬ ফিট লম্বায় ৩২টি আর্চ নির্মাণ করা হয়েছে। উপমহাদেশে এত বড় ঈদগাহ মাঠ দ্বিতীয়টি নেই। পুরো স্থাপনাটি সিরামিকস দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে এবং প্রতিটি গম্বুজ ও মিনারে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জা।

২০১৭ সাল থেকে প্রতি ঈদেই দিনাজপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার লাখো মুসল্লি এখানে ঈদের নামাজ আদায় করে আসছেন।