বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কুসুম্বি ইউনিয়নের নন্দীগ্রাম সড়কের কেল্লাপোশী এলাকায় শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী জামাইবরণ মেলা। আজ রোববার থেকে শুরু হওয়া এ মেলা চলবে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত। মেলায় কেনাকাটার প্রধান আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে বড় মাছ, মৌসুমি ফল, দই-মিষ্টি, ছাতা, নতুন কাপড় ও মসলার সামগ্রী।
মেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
শেরপুর উপজেলার কুসুম্বি ইউনিয়নের নন্দীগ্রাম সড়কের দুই পাশে বসেছে মেলাটি। স্থানীয়ভাবে ‘কেল্লাপোষী’ নামে পরিচিত এই মেলা ‘জামাইবরণ’ মেলা হিসেবেই বেশি পরিচিত। এটি মূলত কেল্লা ও পোষী মৌজার জমিতে বসে। স্থানীয় লোকজনের দাবি, এর সূচনা হয়েছিল ১৫৫৬ সালে।
মেলার কেন্দ্রস্থলে রয়েছে অন্তত ২০০ বছরের পুরোনো একটি বটগাছ। গাছটির নিচে টিনের ছাউনির ভেতরে আছে একটি মাজার। সেখানে ভক্তরা মোমবাতি ও ধূপ জ্বালিয়ে প্রার্থনা করছেন। মেলাকে ঘিরে ‘মাদার’ তোলার আয়োজনও হয়। প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসের দ্বিতীয় রোববার থেকে এ মেলা শুরু হয়। একসময় তিন দিনের হলেও এখন তা সপ্তাহব্যাপী আয়োজনে রূপ নিয়েছে।
মেলার উৎপত্তি
স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, তৎকালীন সময়ে কালুগাজী পীরের বিয়ে উপলক্ষে কেল্লাপোষী দুর্গে নিশান উড়িয়ে তিন দিনব্যাপী আনন্দ–উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখান থেকেই মেলার উৎপত্তি। প্রতিবছর বোরো ধান কাটার পর সেই জমিতেই বসে এ মেলা।
মেলার আকর্ষণ
আজ রোববার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় এক হাজার দোকানের ছাউনি তৈরি করা হয়েছে। মেলার প্রধান আকর্ষণ বড় মাছ ও মাংসের দোকান। এ ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি, নতুন কাপড়, ছাতা, মৌসুমি ফল, আসবাব ও মসলার দোকান। বিনোদনের জন্য আছে মোটরসাইকেল খেলা, নাগরদোলা, সার্কাস এবং মাদার নিয়ে আসা দলগুলোর লাঠিখেলার আয়োজন।
স্থানীয় কলেজশিক্ষক মো. সুজাউদ্দৌলা বলেন, এই মেলা রাজশাহী বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বড়। মেলাকে ঘিরে আত্মীয়তার ঐতিহ্যের বন্ধন আছে শত বছর ধরে। এই মেলা এলাকাজুড়ে উৎসবে পরিণত হয়। এই উৎসবকে ঘিরে আনন্দে মেতে ওঠে কুসুম্বি ইউনিয়নসহ আশপাশের ইউনিয়নের পরিবারগুলো।
জামাইবরণে আত্মীয়তার বন্ধন
মতিউর রহমান নামে স্থানীয় একজন বলেন, এই মেলার দিনগুলোতে মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনিসহ আত্মীয়-স্বজনেরা নাইওরে এসে থাকে। শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে জামাইকে মোটা অঙ্কের সালামিও দেওয়া হয়। আর জামাই শ্বশুরবাড়িতে মেলার বড় মাছ, খাসির মাংস আর মাটির বড় পাতিল ভরে মিষ্টি কিনে হাজির হন।
কুসুম্বি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম পান্না বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও মেলাকে ঘিরে ইতিমধ্যে দূর–দূরান্ত থেকে মেয়ে ও জামাইয়েরা নাইওরে আসতে শুরু করেছে। এই মেলার আশপাশের বাড়িগুলোতে আনন্দে মেতে উঠেছে আত্মীয়স্বজনেরা।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা
মেলা প্রসঙ্গে শেরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জয়নুল আবেদীন প্রথম আলোকে বলেন, মেলা এলাকায় নিরাপত্তার জন্য সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ বছর মেলায় সার্কাস, লাঠিখেলা, মোটরসাইকেলের খেলা প্রদর্শন, শিশুদের বিনোদনের জন্য নাগরদোলা এবং হরেক রকম পণ্যের কেনাবেচার দোকানের অনুমোদন আছে। মেলার দিনগুলোতে মেলা চত্বরে জুয়া ও অশ্লীলতার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



