সময় চলে যায়, মানুষ বদলে যায়, জীবনের ব্যস্ততা আমাদের চারপাশে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়। তবু কিছু সম্পর্ক থাকে, যা বছরের পর বছর পেরিয়েও হৃদয়ের গভীরে অমলিন থেকে যায়। শৈশবের সহপাঠী, মাদ্রাসার দিনগুলো, একসঙ্গে কাটানো হাসি-কান্নার মুহূর্ত—কিছুই হারিয়ে যায় না। ঈদ আসে আনন্দ নিয়ে, আর সেই আনন্দকে আরও পূর্ণতা দেয় প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলনের সুযোগ।
ঠিক তেমনই, ২০১৬ সালের আস-সালেহীন ব্যাচের ১১তম ঈদ পুনর্মিলনী হয়ে উঠেছিল স্মৃতি, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের এক অনন্য মহোৎসব।
পুনর্মিলনীর সূচনা
বরাবরের মতো এবারও ঈদের তৃতীয় দিন পুনর্মিলনীর দিন নির্ধারণ করা হয়। আমাদের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিবিজড়িত ছালেহাবাদ এম.এস. দাখিল মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় দিনের কার্যক্রম। আগেই ঘোষণা অনুযায়ী সকাল ৯টার মধ্যে সবার উপস্থিত থাকার কথা ছিল। অধিকাংশ বন্ধু সময়মতো উপস্থিত হলেও কয়েকজনের স্বভাবসুলভ দেরি ছিল, যা বন্ধুত্বের হাস্যরসাত্মক অংশ হিসেবেই থেকে যায়।
মাদ্রাসায় পৌঁছে আমরা প্রথমে অফিসকক্ষে উপস্থিত হই। সেখানে আগে থেকেই অনেক সহপাঠী আড্ডা ও স্মৃতিচারণায় মেতে ছিলেন। আমরা দীর্ঘ সময় নানা বিষয়ে আলোচনা ও স্মৃতির গল্পে সময় কাটাই।
হুজুরের আপ্যায়ন
এরপর হুজুর আমাদের তাঁর বাসায় আমন্ত্রণ জানান। মাদ্রাসার কাছেই তাঁর বাসা হওয়ায় সবাই একসঙ্গে সেখানে যাই। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের নাশতা ও পানীয়ের ব্যবস্থা করেন। তাঁর এই ভালোবাসা ও আপ্যায়ন আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। আমরা তৃপ্তি নিয়ে নাশতা গ্রহণ করি এবং তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।
স্মৃতির ফ্রেমবন্দি
পরে মাদ্রাসায় ফিরে এসে দেখা যায়, এখনো কয়েকজন বন্ধু অনুপস্থিত। গ্রুপ ছবি তোলার জন্য সবাইকে একত্র করা জরুরি ছিল। এই ফাঁকে নোয়াপাড়া থেকে পুরস্কারের সামগ্রী সংগ্রহ করা হয়। এরপর সবাই উপস্থিত হলে শুরু হয় বহুল প্রতীক্ষিত ফটোসেশন—ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী হতে থাকে ১১ বছরের বন্ধুত্ব, হাসি আর স্মৃতির গল্প।
ঠিক সেই সময় জোহরের আজান ধ্বনিত হয়। সবাই মাদ্রাসা মসজিদে একসঙ্গে জোহরের নামাজ আদায় করি। নামাজ শেষে আমাদের গন্তব্য হয় রঘুনন্দন পাহাড়ের বনাঞ্চল।
প্রকৃতির কোলে আড্ডা
সবুজে ঘেরা সেই মনোরম পরিবেশে পৌঁছে সবাই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। কেউ ছবি তোলে, কেউ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করে, আবার কেউ হারিয়ে যায় পুরোনো স্মৃতির ভেতরে। এরই মধ্যে দিদার ভাই তাঁর গাড়িতে করে নিয়ে আসেন খাসির বিরিয়ানি। এই আয়োজন বাস্তবায়নে তাঁর আন্তরিক পরিশ্রম ও ভালোবাসা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। আমরা সবাই তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।
সবুজ ছায়াতলে বসে একসঙ্গে বিরিয়ানি খাওয়ার সেই মুহূর্ত ছিল শুধু খাবারের নয়—ছিল ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও মিলনের এক অনন্য স্বাদ।
শৈশবের খেলাধুলা
খাওয়াদাওয়ার পর শুরু হয় দিনের সবচেয়ে আনন্দঘন অংশ—খেলাধুলা। কিছু সময়ের জন্য সবাই যেন ফিরে যায় শৈশবের সেই দিনগুলোতে।
- ফুটবল শট প্রতিযোগিতা: প্রথম খেলা ছিল ফুটবল শট দিয়ে পানির বোতলে আঘাত করার প্রতিযোগিতা। সফলদের মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করা হয়।
- বালিশ খেলা: এরপর শুরু হয় বালিশ খেলা—হঠাৎ বাঁশির সংকেতে কেউ বাদ পড়ছে, কেউ হাসিতে ভেঙে পড়ছে; পুরো পরিবেশ তখন আনন্দে মুখর।
- হাড়িভাঙা খেলা: সবশেষে ছিল হাড়িভাঙা খেলা। চোখ বেঁধে ঘুরিয়ে দেওয়ার পর অংশগ্রহণকারীরা কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে চলে যাচ্ছিল, আর দর্শকদের হাসিতে চারপাশ মুখর হয়ে উঠেছিল।
এই খেলাগুলো যেন কয়েক ঘণ্টার জন্য সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল শৈশবের সেই নির্ভেজাল আনন্দে। বয়স বাড়লেও সেই হাসি-আনন্দের অনুভূতি আজও অটুট।
বিদায়ের আবেগ
বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে সন্ধ্যায় মিলিয়ে গেলে সবাই বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নেয়। বিদায়ের মুহূর্তে আনন্দের পাশাপাশি চোখেমুখে ছিল এক অদৃশ্য আবেগ। কারণ, এই মুহূর্তগুলো বারবার আসে না, কিন্তু স্মৃতিগুলো থেকে যায় আজীবন।
আজ আমরা কেউ চাকরিতে, কেউ ব্যবসায়, কেউ প্রবাসে, আবার কেউ উচ্চশিক্ষায় ব্যস্ত। তবু এই পুনর্মিলনী প্রমাণ করে, দূরত্ব কখনো সত্যিকারের বন্ধুত্বকে আলাদা করতে পারে না। ছালেহাবাদ মাদ্রাসার সেই মাঠ, সেই শ্রেণিকক্ষ, সেই বন্ধুরা—সবই হৃদয়ে অমলিন।
হয়তো একদিন চুল পেকে যাবে, বয়সের ভারে চলার গতি কমে আসবে; কিন্তু এই পুনর্মিলনীর স্মৃতিগুলো তখনো মুখে হাসি ফোটাবে। কারণ, কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না, কিছু সম্পর্ক কখনো ফুরিয়ে যায় না।
কৃতজ্ঞতা
এই ১১তম ঈদ পুনর্মিলনী সফল করতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা সব বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী ও অংশগ্রহণকারীর প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রবাসী বন্ধুদের প্রতি, যাঁদের সহযোগিতা ও ভালোবাসা এই আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। পাশাপাশি যারা নেপথ্যে থেকে সময়, শ্রম ও মেধা দিয়ে আয়োজন সফল করেছেন, তাঁদের প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা রইল।
আমরা যতদিন বেঁচে থাকব, ইনশাআল্লাহ ততদিন এই ঈদ পুনর্মিলনীর ধারা অব্যাহত থাকবে। কারণ, এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়। এটি আমাদের বন্ধুত্বের ইতিহাস, শৈশবের স্মৃতি ও হৃদয়ের একটুকরা ভালোবাসার নাম।
লেখক: মোহাম্মদ এনামুল হক, শিক্ষার্থী, কামিল (ফিকহ) জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া কামিল মাদ্রাসা, চট্টগ্রাম।



