অর্থ সংকটে স্ত্রী ছেড়ে চলে যাওয়া সুজনের করুণ জীবনযুদ্ধ
অর্থ সংকটে স্ত্রী ছেড়ে চলে যাওয়া সুজনের জীবনযুদ্ধ

অর্থ সংকটে স্ত্রী ছেড়ে চলে যাওয়া সুজনের করুণ জীবনযুদ্ধ

চাঁদপুর: অর্থনৈতিক সংকট ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মাঝে এক করুণ জীবনযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছেন চাঁদপুরের বাসিন্দা সুজন মজুমদার। একসময়ের সফল ব্যবসায়ী সুজন আজ একা একটি ছোট্ট টিনশেড দোকানে বসবাস করছেন, যেখানে তার সঙ্গী শুধুই স্মৃতি ও বেদনা।

ভালোবাসার অঙ্গীকার ভেঙে যাওয়ার গল্প

সোমবার (৬ এপ্রিল) কাঁদতে কাঁদতে সুজন মজুমদার জানান, "জীবনে যাই হয়ে যাক না কেন-কখনো তোমার হাত ছেড়ে চলে যাব না"—এমন অঙ্গীকার করা স্ত্রী মুক্তা রানী সাহা অর্থ সংকটের মুখে তাকে ছেড়ে চলে গেছেন। শুধু তাই নয়, সঙ্গে নিয়ে গেছেন তাদের একমাত্র পুত্র সন্তান তীর্থ মজুমদারকে এবং সংসারের সমস্ত আসবাবপত্র।

সরেজমিন দেখা গেছে, চাঁদপুর পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের পুরানবাজার নিতাইগঞ্জের বাসিন্দা সুজন বর্তমানে রয়েজরোড সরদার মার্কেটের বিপরীতে একটি এক কক্ষের টিনশেড দোকানে চিপস, চকলেট, কেক-বিস্কুট ও চা বিক্রি করেন। দোকানের মধ্যেই কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা একটি বিছানায় তিনি একা থাকেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জীবনের পথে আকস্মিক বিপর্যয়

সুজন মজুমদার (৪৬) স্থানীয় মৃত সুখ রঞ্জন মজুমদার ও রেবা মজুমদারের চার ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। প্রায় ৩০ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর তিনি নানা কাজে জড়িত হয়ে ভালো আয়-রোজগার করতেন। যুবক বয়সে বলাখাল রামপুরের মেয়ে মুক্তা রানী সাহাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন, যিনি তাকে যেকোনো পরিস্থিতিতে ছাড়বে না বলে আশ্বস্ত করেছিলেন।

সুজন বলেন, "আমি ডিশের লাইনের ব্যবসা করতাম। ২০২০ সালের দিকে ডিশের লাইনের কাজ করতে গিয়ে দুই তলা থেকে অসাবধানতাবশত পড়ে যাই। এই দুর্ঘটনায় আমার পা ও মাজা অনেকটা অবশ হয়ে যায়, যা আমার জীবনকে সম্পূর্ণভাবে এলোমেলো করে দেয়।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতা ও একাকিত্ব

দুর্ঘটনার পর সুজনের স্ত্রীর উচিত ছিল সর্বোচ্চ সেবা-শুশ্রূষা নিয়ে পাশে থাকা, কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সুজন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, "সে উল্টো অন্য পুরুষের হাত ধরে চলে যায়। যাওয়ার সময় আমার অসুস্থ মাকেও একা রেখে সে আমার সন্তানকেও নিয়ে যায়, এমনকি ঘরের সব মালামালও নিয়ে যায়।"

২০২৪ সাল পর্যন্ত সুজন অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু নানা মানুষের সহায়তায় থেরাপি নিয়ে এখন উঠে বসতে ও লাঠি ভর দিয়ে ধীরে ধীরে চলতে পারেন। তিনি মাঝে মাঝে পাশের এক ভাইয়ের বাসায় দুপুরে এক বেলা খাওয়া-দাওয়া করেন। কিছু দয়ালু মানুষ তাকে দোকান চালানোর জন্য চিপস, চকলেটসহ উপকরণ কিনে দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তিনি এখন জীবনযাপন করছেন।

চরম আর্থিক দুরবস্থা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন

সুজনের দোকানের ভাড়া মাসে ১ হাজার ৮শ টাকা, কিন্তু চিপস ও চকলেটের বিক্রি তেমন ভালো না হওয়ায় মাসিক আয়ে দোকান ভাড়া দিয়েই তার হাতে তেমন কিছু থাকে না। তিনি চরম আর্থিক দুরবস্থার মধ্যে সময় কাটাচ্ছেন।

তবুও সুজনের মনে আশার আলো জ্বলছে। তিনি বলেন, "ইচ্ছা আছে, সমাজের দানবীর বা প্রশাসনিক সাহায্য-সহায়তা পেলে দোকানটাতে একটা ফ্রিজ ও বিকাশের ব্যবসাসহ অন্যান্য মুদি মালামাল উঠাব। এরপর সব জেনেশুনে যদি কোনো নারী আমাকে বিয়ে করে তবে তাকে বিয়ে করে আমার জীবনের বাকি পথটুকু চলব।"

সুজন মজুমদারের এই গল্প শুধু একটি ব্যক্তির দুর্ভোগ নয়, বরং অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক সম্পর্কের ভঙ্গুরতা ও মানবিক সহমর্মিতার প্রয়োজনীয়তার একটি জীবন্ত দলিল। তার পরিবারের অন্য সদস্যরাও নিজেদের মতো করে চলছেন, আর বৃদ্ধা মা কখনো ভাই বা বোনের বাসায় থাকেন। সুজনের জীবনযুদ্ধ এখনও চলছে, সমাজের সহায়তা তার জন্য নতুন পথের সন্ধান দিতে পারে।