কুষ্টিয়ায় মাইক-সাউন্ড বক্স বাজানো নিষিদ্ধ, লঙ্ঘনকারীদের কবরস্থানে দাফন বন্ধের হুমকি
কুষ্টিয়ায় মাইক-সাউন্ড বক্স নিষিদ্ধ, কবরস্থানে দাফন বন্ধের হুমকি

কুষ্টিয়ার গ্রামে মাইক ও সাউন্ড বক্স বাজানো নিষিদ্ধ, লঙ্ঘনকারীদের কবরস্থানে দাফন বন্ধের হুমকি

কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের মাজগ্রাম এলাকায় সাউন্ড বক্স ও মাইক সেট বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে স্থানীয় বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদ কমিটি। এই সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে বর্জন করা হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে, এমনকি তাদের কবরস্থানে দাফন করতেও বাধা দেওয়া হবে।

ঘটনার সূত্রপাত ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে ঘোষণা

শনিবার (৪ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়, যাতে দেখা যায় একটি ভ্যানে দুটি মাইক নিয়ে ঘোষণা প্রচার করা হচ্ছে। ৩১ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে স্পষ্ট শোনা যায়, ‘আজ থেকে মহল্লায় সাউন্ড বক্স, মাইক সেট বাজানো নিষেধ। কোনো ব্যক্তি ভুল করিয়া জেনেশুনে সাউন্ড বক্স, মাইক সেট বাজান, তাদেরকে মসজিদ, মাদ্রাসা, গোরস্থান থেকে বহিষ্কার করা হইবে। আদেশক্রমে মাজগ্রাম বড় মসজিদের কমিটিবৃন্দ।’

এর আগে বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী প্রচার মাইকিংয়ের মাধ্যমে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। মসজিদ কমিটির সদস্যরা জানান, ২৭ মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে একটি আলোচনায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মসজিদ কমিটির যুক্তি ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া

বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা ওয়ালীউল্লাহ ফরিদী ব্যাখ্যা দেন, ‘কোরআনে গানবাজনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে সম্প্রতি কিছু বিয়ে ও সুন্নতে খৎনা বাড়িতে উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স বাজানো হয়েছে, যা অসুস্থ মানুষসহ সবার স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত করছে।’ তিনি আরও বলেন, লঙ্ঘনকারীদের ঈদগাহ, মসজিদ ও কবরস্থানের সব কার্যকলাপ থেকে বহিষ্কার করা হবে এবং মসজিদের উন্নয়নে তাদের কোনো সহায়তা নেওয়া হবে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ কুরবান আলী বলেন, ‘বিয়ে ও সুন্নতে খৎনা বাড়ির উচ্চ শব্দের জন্য যেন নামাজ পড়া, কোরআন তেলাওয়াত করা এবং অসুস্থ মানুষের সমস্যা না হয়, সেজন্য সবাই মিলে সাউন্ড বক্স বাজানো নিষেধ করা হয়েছে। তবে একটি নির্দিষ্ট স্থানে প্যান্ডেল করে অনুষ্ঠান করতে কোনো বাধা নেই।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য ও উত্তেজনা

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মসজিদ থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে জমারত আলী ও রুপা খাতুন দম্পতির বাড়িতে তাদের এতিম নাতি আলিফের (৭) শখ পূরণে খৎনা অনুষ্ঠানে সাউন্ড বক্স বাজানো হয়েছিল। রুপা খাতুন বলেন, ‘নাতির শখ পূরণ করতে মাত্র এক দিন বক্স বাজানো হয়েছে, নামাজ ও আজানের সময় বন্ধ ছিল এবং শব্দও কম থাকত। তবু শত্রুতা করে মসজিদ কমিটির কিছু লোক প্রভাব দেখিয়ে গ্রামে ঝগড়া করাচ্ছে।’

এ ঘটনায় তর্কাতর্কি ও উত্তেজনা সৃষ্টি হলে পরদিন শুক্রবার আলোচনার মাধ্যমে গ্রামে মাইক ও সাউন্ড বক্স বাজানো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আইনি দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রশাসনের অবস্থান

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এভাবে গানবাজনা নিষিদ্ধ করার সুযোগ নেই। কেউ অতিরিক্ত শব্দে সাউন্ড বক্স বাজালে তাকে নিয়ন্ত্রণ বা সচেতন করা যেতে পারে, অথবা প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারে, কিন্তু মাইকিং করে বন্ধ করা ঠিক নয়।

বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদের সভাপতি আমির হোসেন বলেন, ‘সব ধরনের গানবাজনা বন্ধ বিষয়টি ঠিক নয়, শুধু উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স ও মাইক বাজানো বন্ধের বিষয়ে সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মাইকিংয়ে কী প্রচারিত হয়েছে, তা আমি জানি না।’

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, ‘প্রশাসন থেকে এমন কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি, বিষয়টি নিয়ে মসজিদ কমিটির সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে।’

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের মতামত

কুমারখালীর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, কবি ও নাট্যকার লিটন আব্বাস বলেন, ‘প্রত্যেকটা মানুষ স্বাধীন, আমরা কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না। এটা বন্ধ করার আইন-এখতিয়ার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। প্রত্যেকের ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি নিজস্ব চেতনা আছে, সুতরাং বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

এই ঘটনা স্থানীয় সম্প্রীতি ও আইনি সীমার প্রশ্ন তুলে ধরছে, যার সমাধানে প্রশাসন ও স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।