ভৈরবে ঈদের আনন্দ: মেঘনা ব্রিজের মিলনমেলা থেকে বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যার স্মৃতি
ছোটবেলার ঈদ আর বড়োবেলার ঈদের মধ্যে পার্থক্য প্রকট। শৈশবে আনন্দ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসত, কিন্তু বড় হয়ে সেই আনন্দ উপলক্ষ তৈরি করে উপভোগ করতে হয়। এবারের ঈদে লেখক নাহিদ হোসাইনের অভিজ্ঞতা শুরু হয় চণ্ডীবের সুমন মোল্লা ভাইয়ের বাসা থেকে। সেখানে সুমন ভাইয়ের সহধর্মিণী ওয়াহিদা আমিন পলির আপ্যায়ন এবং সুমন ভাইয়ের সালামি দেওয়ার আগ্রহে দিনভর আড্ডা জমে। এরপর লেখক ছয়সূতি তার স্ত্রী প্রিয়াংকার নানুবাড়িতে যান, এভাবেই ঈদের প্রথম দিকটা কাটে।
বাসায় বন্দীদশা এবং বের হওয়ার ডাক
ঈদের পরের দিনগুলোতে বাসায় কোনো কাজ নেই, শুধু খাওয়া আর ঘুমের মধ্যে সময় কাটছিল। এমন সময় বন্ধু নাফিসের ফোন আসে, "চলেন বের হই, আর ভালো লাগছে না বাসায়।" লেখকও মনের কথা বললেন, "মনের কথা বললে। কোথায় যাওয়া যায়?" নাফিসের প্রস্তাব ছিল ব্রিজের দিকে যাওয়া। ভৈরবের সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু, স্থানীয়ভাবে যাকে মেঘনা ব্রিজ বলা হয়, সেখানে প্রতিবছর ঈদ উপলক্ষে আনন্দের এক মিলনমেলা বসে। তিন সেতুর নিচে নানা জায়গার মানুষ পরিবার, বন্ধুবান্ধব বা প্রিয়জন নিয়ে জমায়েত হন। আগে শুধু ঝালমুড়ি আর বুট-বাদাম পাওয়া গেলেও এখন বেশ কয়েকটি ফুড কার্ট ও চায়ের দোকান দর্শনার্থীদের চাহিদা মেটাচ্ছে।
প্রিয়াংকার সঙ্গে ব্রিজে প্রথম যাত্রা
প্রিয়াংকাকে নিয়ে লেখক রওনা দিলেন ব্রিজের দিকে। তিন রাস্তার মোড় থেকে প্রিয়াংকা ১০ টাকার বাদাম কিনে নিলেন এবং হেঁটে হেঁটে বাদাম খাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। কিছুক্ষণ হাঁটার পর রিকশা নিয়ে নেওয়ায় প্রিয়াংকা অভিমান করলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রিজে পৌঁছালেন। প্রিয়াংকা বললেন, "আমরা এই প্রথম দুজন ব্রিজে এসেছি, তাই না?" লেখক সম্মতি জানালেন, "হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। অন্য রকম লাগছে।" বাসার খুব কাছেই মেঘনা ব্রিজ, এর আগে সবার সঙ্গে আসা হলেও এই প্রথম দুজনে আসায় লেখকের ভেতর অন্য রকম আনন্দের অনুভূতি কাজ করছিল।
কাবাব ঘরে আড্ডা এবং বন্ধুদের সংযুক্তি
তারা গিয়ে বসলেন ছোট ভাই ইফতির 'কাবাব ঘর'-এ। নদীর ঢেউ, শীতল হাওয়া, ভেজা বাতাসের ঘ্রাণ, গাছের পাতার ফাঁকে নতুন চাঁদের উঁকি—সব মিলিয়ে চমৎকার আবহ তৈরি হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর বন্ধু নাফিস, আদিব ও আনাস তাদের সঙ্গে যুক্ত হলেন। কাবাব ঘরের বিখ্যাত কাবাব আর তেলবিনুন রুটি খাওয়ার পর আদিব মিটবক্স খাওয়ার বায়না ধরলেন। রিকশা নিয়ে তারা বাজারের দিকে রওনা দিলেন, গন্তব্য ছিল বোমপট্টিতে অবস্থিত ফুড কার্টগুলো। সেখানেও বেশ কয়েকটি ফাস্ট ফুডের কার্ট হয়েছে, দিন দিন যার সংখ্যা বাড়ছে।
ক্রেভিংসে আড্ডা এবং গানের মজা
তারা গিয়ে বসলেন ছোট ভাই রাজনের ক্রেভিংসে, যেখানে মোশারফ রাব্বিও যোগ দিলেন। রাব্বির গানের গলা বেশ ভালো, প্রায়ই তিনি সবাইকে গান শোনান। মিটবক্স আসামাত্রই আদিব তা লুফে নিলেন, তার আগ্রহ নিয়ে খাওয়া দেখতে খুব ভালো লাগছিল। আড্ডা জমে উঠছিল, কিন্তু আকাশের মেঘের গুঞ্জন আর বিদ্যুতের ঝলকানি মনে করিয়ে দিল যে বাসায় ফিরতে হবে।
বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা এবং বাজারের অভিজ্ঞতা
নাফিস আর আদিবকে রিকশায় উঠিয়ে দিয়ে লেখক ও প্রিয়াংকা হাঁটা শুরু করলেন পুলের তলের বাজারের দিকে। এই জায়গার আরেকটি নাম 'মনা মরা ব্রিজ', কারণ এখানে মনা নামের কেউ একজন ব্রিজ থেকে পড়ে মারা গিয়েছিলেন। বাজারে ঢোকামাত্রই প্রবল বর্ষণ শুরু হলো। দোকানিরা জিনিসপত্র রেখেই নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিলেন, ব্যস্ত বাজার মুহূর্তেই নীরব হয়ে গেল। শুধু মেঘের গর্জন আর বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছিল, মাঝেমধ্যে কয়েকটা রিকশা ও গাড়ি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। এর মধ্যেই প্রিয়াংকা ছয় কেজি ওজনের বিগহেড মাছ আর পুঁইশাক কিনে নিলেন। বৃষ্টি কমে এলে বাতাসের গন্ধ লেখকের মন ভালো করে দিল। বুক ভরে সেই বাতাস টানতে টানতে তারা বাড়ির দিকে চললেন। এই ভেজা সন্ধ্যার ঈদ-আনন্দ মনে থাকবে অনেক দিন।
লেখক নাহিদ হোসাইন, শিক্ষক, ব্লু বার্ড স্কুল, ভৈরব, কিশোরগঞ্জ থেকে এই গল্পটি শেয়ার করেছেন। নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠানো যায়।



