বিয়ের প্রাক্কালে সড়ক দুর্ঘটনায় বরের মৃত্যু, কনের বাড়িতে প্যান্ডেল ভাঙার করুণ দৃশ্য
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চণ্ডীপুর বড় ছয়ঘটি গ্রামে এক মর্মান্তিক ঘটনায় বিয়ের প্রাক্কালে সড়ক দুর্ঘটনায় বরের মৃত্যু হয়েছে। কনের বাড়িতে সাজানো বিয়ের প্যান্ডেল ভেঙে ফেলা হচ্ছে, যেখানে গতকাল রাতেই কনের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছিল। আজ রোববার সকালে বরের গায়েহলুদের জন্য পায়েস রান্নার দুধ আনতে গাড়ি চালানোর সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
বর জুলফিকার ইসলাম জিল্লুর রহমান পাবনার ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া নওদাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও একজন প্রকৌশলী। আজ সকাল আটটার দিকে তিনি নিজের প্রাইভেট কার চালিয়ে দুধ আনতে দাশুড়িয়া থেকে নাটোর যাচ্ছিলেন। নাটোর হাইওয়ে গড়মাটি কলোনি রোডে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায় এবং পাশে দাঁড়ানো ট্রাকে লেগে দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
বরের মৃত্যুর খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই বাড়িতেই বিয়ের উৎসব মাতমে পরিণত হয়। কনের বাড়িতে সাজানো প্যান্ডেল ভেঙে ফেলা শুরু হয়, কারণ পরিবারের সদস্যরা এ দৃশ্য আর সহ্য করতে পারছিলেন না। বন্ধন ডেকোরেটরের মালিক হৃদয় আহমেদ জানান, প্যান্ডেলে বসে কনের মুখে ক্ষীর দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এখন তা ভাঙার কাজ চলছে।
কন্যা অন্তরা খাতুনের জীবনসংগ্রাম
কন্যা অন্তরা খাতুন বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করছেন। তাঁর জীবন সংগ্রামময়: ২২ বছর আগে দুরারোগ্য ব্যাধিতে বাবা মারা যান, মা রওশন আরা অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন, আর ভাই সোহেল রানা রাজমিস্ত্রির কাজ করে তাঁকে পড়াশোনা করান। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে তিনি সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পান, এবং ২০২২ সালের ১০ এপ্রিল র্যাব-৫–এর অধিনায়কের পক্ষ থেকে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মারুফ হোসেন খান তাঁর বাড়িতে এসে ভর্তির টাকা তুলে দেন।
গতকাল শনিবার কনের গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে বরপক্ষের লোকজন উপস্থিত হয়ে তাঁকে মিষ্টিমুখ করান। আজ সকালে ক্ষীর দেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল, কিন্তু বৃষ্টির কারণে তা পিছিয়ে যায়। ঠিক তখনই বরের মৃত্যুর খবর আসে।
পরিবারের প্রতিক্রিয়া ও সমবেদনা
অন্তরা খাতুনের চাচি রোজিনা বেগম বিষণ্নবদনে ক্ষীরের মঞ্চ ভাঙার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, “রাতে বরপক্ষের লোকজন এসে মেয়েকে মিষ্টিমুখ করে গেছেন। স্থানীয় লোকজন মেয়ের মুখে ক্ষীর দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, এমন সময় বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির কারণে তাঁরা সকালে ক্ষীর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সকাল আটটার দিকেই খবর চলে আসে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তরার বর মারা গেছেন।”
অন্তরার ভাইয়ের শাশুড়ি সালমা বেগম যোগ করেন, “একটা বিয়ের উৎসব এ রকম কইরি মাটি হয়্যা যাবি, এডি আমরা কেউ কল্পনাই করতে পারিনি। বোধ হয় এই ছিল মেয়েডার কপালের লেখন।” চাচা আবদুর রহিম কোনো কথা বলতে পারেননি, শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।
সকালে সারা গ্রামের মানুষ অন্তরাদের বাড়িতে জড়ো হয়ে মেয়েটির জন্য আফসোস ও সমবেদনা জানান। এই ঘটনা স্থানীয় সম্প্রদায়কে গভীর শোকে আচ্ছন্ন করেছে, এবং বিয়ের আনন্দ হঠাৎ করেই শোকে রূপ নেওয়ার মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে থাকবে।



