উইপোকার ডানায় চড়ে এক মানুষের শহরের অদ্ভুত যাত্রা ও বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া
উইপোকার ডানায় চড়ে মানুষের শহর যাত্রা ও বাস্তবতা

ঘুম থেকে ওঠার পর এক অদ্ভুত যাত্রার শুরু

ঘুম থেকে উঠতে তার বরাবরই দেরি হয়; কখনো কখনো দুপুর গড়িয়ে যায়। আজ আরও বেশি দেরি হয়েছে, কিন্তু সমস্যা নেই, কারণ হাতে তার অফুরন্ত সময়। দুহাত খুলে তিনি জীবনকে খরচ করেছেন, আর এখন যতটুকু বাকি আছে, তা নিয়েও কোনো তাড়াহুড়ো নেই। অবশ্য ইদানীং কোনো বিষণ্ন সন্ধ্যায় একটা অপরাধবোধ উঁকি দেয় মাঝে মাঝে, যা তাকে ভেতর থেকে অস্থির করে তোলে। কিন্তু আজ কোনো কিছুই উঁকি দিচ্ছে না, সবকিছু শান্ত মনে হচ্ছে।

দেহ হারানো এবং উইপোকার ডানায় চড়ে বেরিয়ে পড়া

ঘুম ভাঙার পর কক্ষের দরজা, জানালা কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না, সবকিছু উধাও হয়ে গেছে বিনা নোটিশে! ঘরময় একটা শীতল অন্ধকার ছেয়ে আছে, সুইচটাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ডান পা, বাম পা কোথায় গেল? হাত, নাক, কান, গলা, পাকস্থলী, হৃৎপিণ্ড সব নিরুদ্দেশ! ভয়ংকর ব্যাপার; সে কিছুটা ভয় পায়। মাথার ভেতরে থলথলে মগজ নড়েচড়ে ওঠে, পাশেই মোবাইলটা এখনো চালু আছে। ভাগ্যিস মগজটাও কিছুটা সচল আছে এখনো।

মানুষটা তার ইতিহাস আর অনির্মিত ভবিষ্যতের রূপরেখা পেয়ে গেছে, কিন্তু বর্তমানকে বেমালুম ভুলে গেছে। একটা উইপোকার ডানায় চেপে বসে, দেয়ালের কার্নিশের ফাটলটা গলিয়ে বেরিয়ে পড়ে সামনের বারান্দায়। একটু থামে, একটা দীর্ঘশ্বাস নেয়। আলোটাকে অনেকটা কৃত্রিম মনে হয়। সিঁড়ি ভেঙে নেমে এগিয়ে যায় সরু গলির মোড়টায়; ফলের দোকানে বাহারি ফল। দোকানিদের নামগুলো সব মুখস্থ, কিন্তু আজ একটু আগাতেই সব কিছু অচেনা লাগছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শহরের ঘটনাবলি: নির্মাণ দুর্ঘটনা থেকে সেলিব্রিটি সমস্যা

সামনে একটা জটলা। এ শহরে জটলা লেগেই থাকে। নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারের একটা অংশ ধসে পড়েছে, একজন মা আর তার শিশু নিচে থেঁতলে আছে। এখানে থেমে লাভ নেই, তদন্তকাজ চলছে অথবা শুরু হবে খুব তাড়াতাড়ি; কেতাবিভাবে বললে, খতিয়ে দেখা হচ্ছে বিস্তারিতভাবে। মানুষটি আগায় সামনে, ওখানে আরো বড় জটলা, শহরের সবাই চিন্তিত। জনপ্রিয় একজন নায়িকা তার স্বামীকে শনাক্ত করতে পারছেন না, সবাই উদ্বিগ্ন; এমনকি প্রশাসনও।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কোনো পরামর্শ ছাড়াই উইপোকা ডান দিকে বাক নেয়। মানুষটি শান্তভাবে দেখতে থাকে অসহায়, রুগ্ন প্রকৃতিকে। চারদিকে নানান রকমের মানুষ, শুধু ছুটছে। একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসে; আনন্দ না কান্না বোঝা কঠিন। শব্দরা জট পেকে যাচ্ছে মহানগরীতে। ভীত হয়ে মানুষটি ভাবছে একটু অনুরোধ করবে যেন একটু সাবধানে চলে। ভাবলেশহীনভাবে আগাতে থাকে উইপোকা, সামনে একটা বহুতল ভবন। সদ্য গজিয়ে উঠেছে রুগ্ন জলাশয় দখল করে। ধাক্কা লাগে, আছড়ে পড়ে ভবনের একটা সেমিনার কক্ষে।

সেমিনার কক্ষে গুরুত্বপূর্ণ মানুষের পরিকল্পনা

দেশের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ নানান বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একটু চেনা চেনা লাগছে মানুষটার। "একদিন আমি এদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে চেয়েছিলাম। এরা দেশ, সমাজ, জনপদ ধ্বংস করেছে। আমি এদের ঘৃণা করি"। চিৎকার করতে থাকে মানুষটা। মানুষটার অসহায় দশা দেখে উইপোকা হাসে এবং কিছুটা বিভ্রান্ত হয়।

"আস্তে বলো, ওদের সঙ্গে আগামী সপ্তাহে আমার একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে। একটা প্রজেক্ট পাবো বলে আশা করি। এদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ানো যাবে না"। উইপোকা বলে।

  • কীসের প্রজেক্ট? মানুষটি জিজ্ঞেস করে।
  • এ শহরের সবাইকে শিক্ষিত বানানোর প্রজেক্ট। মানে সবাইকে এমএ পাস করানো। উইপোকা উত্তর দেয়।
  • তা কতদিনে করবে?
  • ওনারা যতদিনে চাইবে।
  • এটা করে কী হবে?
  • কী আর হবে, সবাই এম এ পাস এই আনন্দে বুঁদ হয়ে থাকবে। চারপাশের সবকিছু ভুলে যাবে।
  • এরা কাজ চাইবে না? বিস্ময়ভরে জিজ্ঞেস করে মানুষটি।
  • এখানে কেউ কাজ চায় না, চাকরি চায়। সবাই চাকর হতে চায়। বিড়বিড়িয়ে আওড়াতে থাকে উইপোকাটি।

উইপোকার জ্ঞান এবং পার্কের আধুনিকীকরণ প্রকল্প

"তুমি কেমন করে এত কিছু বোঝো?" জিজ্ঞেস করে মানুষটি। "তুমি যুদ্ধবিরোধী স্লোগান দাও, নারী মুক্তির মিছিলে যাও, বাকচিন্তার স্বাধীনতা চাও, শ্রমিকের মুক্তির মিছিলে হাঁটো কিন্তু আমার ডানা থেকে যে নেমে যাওয়া দরকার সেটা বোঝো না। আমাকে যে একটু স্বস্তি দেওয়া দরকার তা বোঝ না"

মোবাইলের ব্যাটারির চার্জ কমে যাওয়ার অ্যালার্মে ঘুম ভাঙে মানুষটার। জেগে দেখে কাল জানালাটি খোলা হয়নি। উইপোকাটি জিজ্ঞেস করে, "তুমিতো বেকার, মানে কর্মহীন; বিপ্লবের সম্ভাবনাও অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে, এখন কী করবে?" মানুষটি জানে না কী করবে, কোথায় যাবে?

উইপোকা তাকে আরো একটা প্রজেক্টের কথা জানায়, জানায় তার ব্যস্ততার কথা। "শহরের কেন্দ্রীয় পাবলিক পার্ক আমরা অত্যাধুনিক করছি। এটা আরো মডার্ন করা হবে"

  1. এই মডার্নিটিটা কেমন? মানুষটি জিজ্ঞেস করে।
  2. এই যেমন সব গাছপালা, লতা গুল্ম কেটে পুরোটা ভরাট করবো, এরপর একটা আর্টিফিসিয়াল লেক বানানো হবে, প্লাস্টিকের গাছ বসানো হবে। নানান ইলেকট্রনিক্স বোর্ড বসানো হবে।
  3. তাহলে পাখিদের কী হবে?
  4. অসুবিধে নেই, বিদেশ থেকে প্লাস্টিকের পাখি আনা হবে।
  5. তাহলে পাখিদের গান?
  6. সেও একটা আর্টিফিসিয়াল মিউজিকের ব্যবস্থা করা হবে।

"সেজন্য আগামী মাসে ১১ সদস্যের একটা টিম যাচ্ছি ইউরোপে। আলোতে ঝলমল করবে পাবলিক পার্ক। পাবলিক বাইরে দাঁড়িয়ে দেখবে, তাদের চোখ ধাঁধিয়ে যাবে। শুধু ভেতরে ঢোকার পারমিশন থাকবে না"। উন্নয়ন হবে আর তারা শুধু দর্শক হয়ে থাকবে।

"তাহলে এটা কী হলো?" মানুষটি জিজ্ঞেস করে। "এসব তুমি বুঝবে না। মানুষ হয়ে জন্মানোর এটা একটা সমস্যা। তার চেয়ে তুমি আর একটা দীর্ঘ ঘুম দাও, আর একটা স্বপ্ন দেখো। আমার ডানা থেকে নেমে যাও। আমি এখন জরুরি একটা মিটিংয়ে যাবো"

ফ্লাইওভার ভাঙা এবং শেষে ঘুমে ফিরে যাওয়া

উইপোকা মানুষটাকে ফেলে রেখে যায় একটা ফ্লাইওভারের ওপরে। অনেকজন মানুষ মিলে ভাঙছে কয়েক বছর যাবৎ তৈরি হওয়া ফ্লাইওভার। মানুষটি জিজ্ঞেস করে, "এটা ভাঙছেন কেন?" কয়েকজন শ্রমিক কাজ থামিয়ে সমবেত স্বরে বলে, "ভুল হয়ে গেছে, নতুন করে বানাতে হবে"। মানুষটি ভাবে, এত জ্ঞানী মানুষরাও ভুল করে তাহলে! আচ্ছা এর খরচ কে দেবে? এর দায় কেউ নেবে না? "আমার আর সমস্যা কী। ভুল করাটা বোধহয় মানুষের অধিকার"

মানুষটার আর কোনো অনুশোচনা রইল না, ঘুমটাকে আরও দীর্ঘ করার চেষ্টায় ডুবে গেল। মোবাইলের চার্জটাও শেষ হয়ে গেল, সবকিছু নীরবতায় মিলিয়ে যায়।