ঢাকার বেঙ্গল শিল্পালয়ে চলছে তাঁতশিল্প মেলা ও প্রদর্শনী, দেশীয় পণ্যের সমাহার
ধানমন্ডিতে তাঁতশিল্প মেলা, দেশীয় পণ্যের প্রদর্শনী

ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে দেশীয় তাঁতশিল্পের সমৃদ্ধ প্রদর্শনী ও মেলা

ঢাকার ধানমন্ডিতে অবস্থিত বেঙ্গল শিল্পালয়ে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উদ্যোগে এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় চলছে একটি বিশেষ তাঁতশিল্প মেলা ও প্রদর্শনী। ৮ মার্চ থেকে শুরু হয়ে ১৬ মার্চ পর্যন্ত চলবে এই আয়োজন, যেখানে প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীরা অংশ নিতে পারবেন। মেলাটি বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের দ্বিতীয় তলার গ্যালারি এবং চতুর্থ তলার উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে মোট ১৫টি স্টল স্থাপন করা হয়েছে দেশীয় তাঁতশিল্পের নানান পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির জন্য।

মণিপুরি শাড়ি থেকে জামদানি: কম্বো সেটে সাজছে ফ্যাশন

মেলায় অংশগ্রহণকারী স্টলগুলোর মধ্যে রিংকিস অ্যাটায়ারের স্বত্বাধিকারী রেহমুমা হোসেন শ্রীমঙ্গলের মণিপুরি হ্যান্ডলুম নিয়ে কাজ করছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, কাপড়ের কোনো টুকরাই তিনি ফেলেন না; বরং সেগুলো ব্যবহার করে গয়না, ব্যাগ বা অন্যান্য সামগ্রী তৈরি করেন। বর্তমান সময়ের ফ্যাশন সচেতন নারীরা এই কম্বো সেটসহ বিভিন্ন পণ্য বেশ পছন্দ করছেন, যা মেলায় সহজলভ্য।

অন্যদিকে, ফেস্টডিলস স্টলের রুমানা নাসরীন নারায়ণগঞ্জের জামদানি পণ্য নিয়ে কাজ করছেন, যেখানে জামদানি কাপড় দিয়ে কোটি, ব্লেজার, জুতা ইত্যাদি তৈরি করা হচ্ছে। মেলায় রাঙামাটির ঊর্মিলা ফ্যাশন স্টলেও ক্রেতাদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা গেছে, যা দেশীয় পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহেরই প্রতিফলন।

ঐতিহাসিক নকশার পুনরুদ্ধার ও উচ্চমূল্যের শাড়ি

মেলায় সবুজ সাজ স্টলের মো. মমিনুর রহমান জামদানি শাড়ির হারিয়ে যাওয়া মোটিফগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন। তিনি ১৮৮০ শতকের একটি নকশা, যা লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে, তার অনুকরণে ২৫০ কাউন্ট সুতায় একটি শাড়ি তৈরি করেছেন। এই শাড়িটি বানাতে তিন মাসের বেশি সময় লেগেছে এবং এটি প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে। এছাড়া, ডালিম ফুলের নকশার আরেকটি শাড়ির দাম রাখা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা, যা সময় ও শ্রমের কারণে উচ্চমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

হ্যান্ডটাচ স্টলের মোহাম্মদ আলী খান পঞ্চগড়ের কারখানা থেকে খাদির টেবিল ক্লথ, প্রাকৃতিক রঙের শাড়ি, ওড়না, গামছা ইত্যাদি বিক্রি করছেন। সিরাজগঞ্জের তৌহিদ টেক্সটাইল স্টলে হাতে বোনা তন্তুজ শাড়ির দাম ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ক্রেতাদের জন্য কিছুটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

প্রদর্শনীতে তাঁতশিল্পের ইতিহাস ও প্রযুক্তি

মেলার পাশাপাশি প্রদর্শনীতে তাঁতশিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন উপকরণ, প্রযুক্তি ও কৌশল উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড মসলিন পুনরুদ্ধারের একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার অংশ হিসেবে হারিয়ে যাওয়া ফুটি কার্পাস তুলা থেকে সুতা তৈরি এবং মসলিন কাপড় বুননের প্রক্রিয়া প্রদর্শনীতে দেখানো হচ্ছে। এছাড়া, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তাঁতবস্ত্রের নির্বাচিত নমুনাও এখানে স্থান পেয়েছে।

বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের দ্বিতীয় তলার গ্যালারিতে প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো জামদানি ও টাঙ্গাইল শাড়ি প্রদর্শন করা হচ্ছে। সাথে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য, রেশমের জীবনচক্র, তাঁতশিল্পের ঐতিহাসিক নথি, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং বিভিন্ন ধরনের সুতা ও তাঁতযন্ত্রও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

ক্রেতা ও বিক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া

মেলায় ক্রেতারা মূলত দেশীয় পণ্য কেনার আগ্রহ প্রকাশ করছেন, যদিও কিছু পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি বলে মনে করছেন। যেমন, মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের শিক্ষক মুক্তি সরকার একটি শাড়ি পছন্দ করলেও বাজেটের অভাবে কিনতে পারছেন না। অন্যদিকে, বিক্রেতারা ক্রেতাভেদে বিশেষ ছাড় দিচ্ছেন, যেমন 'শুধু আপনার জন্য ৫০০ টাকা কম' এর মতো অফার।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের প্রধান মো. আইয়ুব আলী এবং ব্যবস্থাপক (বিপণন) মো. এবাদত আলী জানান, মেলা ও প্রদর্শনী সফলভাবে চলছে এবং টাঙ্গাইল, রাজশাহী, মিরপুর, রূপগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার ঐতিহ্যবাহী পণ্য এখানে পাওয়া যাচ্ছে। তারা আশা প্রকাশ করেন যে, এই আয়োজন দেশীয় তাঁতশিল্পের প্রচার ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।