মাধবীলতার ফুল ফোটার দিনে অপু কথা বলতে শিখল, কিন্তু সবকিছু কি আগের মতোই?
মাধবীলতার ফুল ফোটার দিনে অপু কথা বলতে শিখল

মাধবীলতার ফুল ফোটার দিনে অপু কথা বলতে শিখল

সকালে উঠে অপু প্রতিদিনের মতোই গালি দিল, ‘ধুর বাল, ভাল্লাগে না!’ পাজামার ফিতা এমন গিট্টু বেঁধে বসেছিল যে ঘুম থেকে উঠে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মেপে মেপে কায়দা করে ভাঁজ খুলতে হয়। প্রতিদিন মনে মনে গালি দিত, কেউ শুনতে পেত না। আজ মুখে বলল, শোনা গেল। ভাগ্যিস আশপাশে কেউ ছিল না, থাকলে সবাই অবাক হয়ে যেত।

মায়ের ভবিষ্যদ্বাণী এবং ফুল ফোটার রহস্য

অপু জানত আজ অন্য রকম হবে। তার শোবার ঘরের জানালার ধারে মাধবীলতাগাছে তেইশ বছর পর ফুল ফুটেছে। সাদা পাপড়িতে হলদেটে ছাপওয়ালা কয়েকটা ফুল ফুটেছে মাত্র। অপুর বয়স বাইশ। মা বলেছিল, ‘যেদিন সকালে এ গাছে ফুল ফুটল, সেদিনই আমি প্রথম বুঝছি যে তুই পেটে আসছিস।’ মা আরও বলেছিল, ‘আবার যেদিন ফুল ফুটবে, সেদিন দেখবি ভালো কিছু হবে, খুব ভালো।’ মা থাকলে দেখতে পেত, আজ আবার ফুল ফুটেছে, আর অপু গলা খুলে গালি দিচ্ছে।

পরিবার এবং সম্পর্কের জটিলতা

আব্বা কোর্টে গেছে পৈতৃক জমির মামলায়। ফোন বন্ধ থাকায় কথা বলা যায়নি। সাফিয়াকে ফোন করলে সে কেটে দিল। এসএমএসে অপু লিখল, ‘ফোনটা ধরো, একটা দারুণ সারপ্রাইজ আছে।’ উত্তর এল, ‘খচ্চরের বাচ্চা, তুই কথা বলবি! তুই কথা বলতে জানস?’ সাফিয়া ব্লক করে দিল সব জায়গা থেকে। দুই দিন আগের ঝগড়ার পর এমনই করছে। শাশুড়িকে মেসেজ করল, ‘আম্মা, সাফিয়াকে একটু ফোন ধরতে বলেন। খুব জরুরি।’ শাশুড়ি লিখলেন, ‘অপু আব্বা, সাফিয়া খুব রেগে আছে। সন্ধ্যায় বুঝায়-শুনায় ওকে তোমাদের বাসায় পাঠায় দিব।’

অপু সাফিয়াকে বিয়ে করে গত বছর। অপুর তখন একুশ আর সাফিয়ার উনিশ। আব্বা কোনো আপত্তি করেননি, জানতেন এখন বিয়ে না হলে আর হবে না। সাফিয়া জানে অপুর না বলা ভাষা। গভীর রাতে তাদের গল্পে নৈঃশব্দ্য ভেঙে যায়, কেউ শুনতে পায় না।

পুরোনো স্মৃতি এবং নতুন অভিজ্ঞতা

অপু দাদিজানের কাছে গেল। দাদি স্মৃতিভোলা, অপুকে চিনতে পারে কিন্তু ঠিক কে মনে রাখে না। ‘দাদি, দেখছো কাণ্ড! আমি কীভাবে গড়গড় করে কথা বলতেছি?’ দাদি উত্তর দিল, ‘তুই তো সবসোম এমতেই কথা কইছথ।’ দাদির কাছ থেকে বেরিয়ে অপু হানিফ বিরিয়ানিতে গেল। চিৎকার করে শিস বাজিয়ে দুই প্লেট বিরিয়ানি খেল। এ দোকান তার স্বপ্নের দোকান, আগে এসে অপমানিত হয়েছিল, আজ গলা ছেড়ে হল্লা করল।

বন্ধুত্ব এবং ক্ষমা চাওয়া

তৌহিদের অফিসে গিয়ে অপু কথা বলতে শুরু করল। তৌহিদ অবাক হয়ে গেল, ‘তুই কথা বলতেছিস! ক্যামনে অপু, ক্যামনে?’ অপু বলল, ‘তুই ক্যান এত হ্যাপি রে, কুত্তার বাচ্চা?’ তৌহিদের সাথে পুরোনো অভিমান মনে করিয়ে দিল অপু, বন্ধুত্ব ডিসমিস করল। তৌহিদের অফিস থেকে বেরিয়ে চোখ ভিজে গেল অপুর।

চিত্তরঞ্জনদার রুপার দোকানে গিয়ে অপু ক্ষমা চাইল। বারো শ টাকা ফেরত দিল, অনেক আগে একটা আংটি চুরি করার জন্য। দাদা টাকাটা নিল না, কিছু মনে নেই বলে। অপু পকেটে টাকা রেখেই ফিরে এল।

মায়ের কবরে শেষ কথা

আম্মার কবরের পাশে বসে অপু অনেক গল্প করল। বলল, ‘আম্মা, আজকে তোমার মাধবীলতাগাছে আবার ফুল ফুটেছে। আজকে তো আমার কথা বলবার দিন।’ সাফিয়ার সাথে পরিচয়ের গল্প শোনাল, কীভাবে মূক ও বধির সেন্টারে দেখা হয়েছিল। ‘আম্মা, আমি আজ এমন মানুষের মতন কথা বলছি কেমন করে? তুমি অবাক হচ্ছ, না?’

শেষ দৃশ্য: ফুলশূন্য গাছ এবং আশার বার্তা

বাসায় ফিরে অপু দেখল মাধবীলতা গাছের ফুল কে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। আব্বা পাশে এসে দাঁড়াল, ‘সারা দিন কই ছিলি, অপু?’ সাফিয়া ফিরে এসেছে, তার শরীরের বেলিফুলের সুঘ্রাণ ঘরজুড়ে। তিনজন এক হয়ে দাঁড়াল। অপু হাত উঁচু করে আব্বা আর সাফিয়াকে মাধবীলতা গাছ দেখাল, ফুলশূন্য একাকী দুলছে।

আব্বা বলে, ‘এই গাছে একদিন ফুল ধরবে, দেখিস। সেদিন সব ভালো হবে, খুব ভালো।’ সাফিয়া আঙুলের খেলায় ইশারায় জিজ্ঞেস করে, ‘ফুল ফুটেছিল, অপু?’ অপু মাথা নাড়ে। সাফিয়া বলে, ‘তুমি কিছু বলতে চেয়েছিলে?’ অপু দুচোখ ভরে হাসে। ‘আজ থাক। আবার যেদিন মাধবীলতা ফুটবে, আমি তোমাদের আমার ভালোবাসার কথা শোনাব।’