শ্রাবণ ও ইন্দুর অপ্রেমের গল্প: ভালোবাসা ছাড়াই বিয়ে, সময়ের সঙ্গে বন্ধুত্বের রূপান্তর
শ্রাবণ-ইন্দুর অপ্রেমের গল্প: ভালোবাসা ছাড়াই বিয়ে

শ্রাবণ ও ইন্দুর অপ্রেমের গল্প: ভালোবাসা ছাড়াই বিয়ে, সময়ের সঙ্গে বন্ধুত্বের রূপান্তর

বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছর ধরে শ্রাবণ ও ইন্দু শুধু সহপাঠী ছিলেন, প্রেম বা গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। সামনে পড়লে দু-একটা কথা হতো, কিন্তু তাদের জীবনযাত্রা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। শ্রাবণ ছিলেন ডিপার্টমেন্টের পরিচিত মুখ, সব অনুষ্ঠানে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী, পর্দার সামনে বা পেছনে। অন্যদিকে, ইন্দু ছিলেন এক অসামাজিক প্রাণী, প্রয়োজনীয় ক্লাস ছাড়া ক্যাম্পাসে পা পড়ত না তার।

বিপরীতমুখী আকর্ষণ ও নীরব সাধনা

দ্বিতীয় বর্ষের শুরুতে, সাদা পাঞ্জাবি পরে শ্রাবণ যখন 'মায়াবনবিহারিণী' গান গাইলেন, তখন ইন্দু জীবনের বৈচিত্র্য উপলব্ধি করলেন। তার ইচ্ছা জাগল শ্রাবণের মতো প্রাণ ভরে বাঁচতে, গাইতে, হাসতে। কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও, তিনি নিজের গণ্ডির বাইরে আসতে পারেননি। এরপর সব অনুষ্ঠানে তিনি যেতেন, এক কোণে দাঁড়িয়ে শ্রাবণের গান শুনতেন, তার হাস্যোজ্জ্বল মুখ ও চশমার আড়ালের চোখ দেখতেন।

একবার সামনে পড়লে শ্রাবণ কপট বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'ইন্দুমতী যে! কী মনে করে? ভুলে ক্লাস আছে ভেবে চলে এসেছ?' ইন্দু কিছু বলতে পারলেন না, শুধু মনে বেজে উঠল রবীন্দ্রনাথের সুর, 'দূর হতে আমি তারে সাধিব...' এই নীরব সাধনাতেই দিন কেটে গেল, ফাইনাল সেমিস্টার এল দোরগোড়ায়।

বাজি, চাকরি ও বিয়ের চাপ

এক রাতে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এল, শ্রাবণের কণ্ঠে বাজির প্রস্তাব: 'কে বেশি সিজি তুলবে এবার, তুমি না আমি? যে জিতবে, তার একটা স্পেশাল ট্রিট পাওনা।' বাজিতে শ্রাবণ হেরে গেলেন, কিন্তু এ বিষয়ে আর কোনো কৌতূহল দেখালেন না। কনভোকেশনের দিনও তার দেখা পাওয়া গেল না। ইন্দু অপেক্ষায় রইলেন, ঠিক কিসের জানা নেই।

এরপর বাড়ি থেকে পাত্রদের খোঁজ শুরু হলো, তা ঠেকাতে মাস্টার্স উপেক্ষা করে ইন্দু চাকরির খোঁজ শুরু করলেন। বছর দুই কেটে গেল, তিনি একটি ব্যাংকে চাকরি পেলেন, কিন্তু বাড়িতে বিয়ের চেষ্টা বেড়ে গেল বহুগুণ। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আবার এলেন শ্রাবণ, একপশলা বৃষ্টি নিয়ে।

পাওনা পরিশোধ ও বিয়ের প্রস্তাব

শ্রাবণ বললেন, 'বাজিটার কথা মনে আছে, ইন্দুমতী? ভেবেছিলাম জিতব। পাওনাটাও আমিই পাব। তুমি তা হতে দিলে কই! তাই দেখো, কত কাঠখড় পুড়িয়ে চাকরি একটা জুটিয়ে তারপর এলাম। লেকচারার হয়ে গিয়েছি বুঝলে? বেকার, গান গেয়ে বেড়ানো ছেলেদের তো তোমার বাবার মনে ধরবে না! পাওনা পরিশোধ করতেও আর কোনো সমস্যা নেই। তো বলো, কী চাও?'

ইন্দু রাজ্যের অস্থিরতা মনে চেপে বললেন, 'কিছু না।' শ্রাবণ উত্তর দিলেন, 'জানতাম! তাই আমি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছি। দূরে না দাঁড়িয়ে পাশে বসে আমার গান শুনবে, ইন্দু? সব সময়?' সেবারও ইন্দু কিছু বলতে পারলেন না, প্রেমটাও হয়ে উঠল না। কিন্তু এই সুযোগ্য পাত্রের আকর্ষণীয় সম্বন্ধ লুফে নিলেন তার বাবা।

সময়ের সঙ্গে রূপান্তর ও ভালোবাসার প্রশ্ন

এক অপ্রেমের গল্প নিয়ে ইন্দু জুড়ে গেলেন শ্রাবণের সঙ্গে। সময় পেরোল, তারা পাল্টালেন, কিন্তু তাদের অপ্রেম পাল্টাল না। শ্রাবণ ইন্দুকে ডাকতে লাগলেন 'ইন্দুর সঙ্গে একেকটি বিশেষণ জুড়ে'। আজও যখন ইন্দু জিজ্ঞেস করেন, 'প্রেমে পড়েছিলে?' শ্রাবণ হেসে উত্তর দেন, 'উঁহু, ভালোবেসেছি।' এটি প্রেমের গল্প নয়, বরং জীবনযাপনের এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে ভালোবাসা ছাড়াই বিয়ে হয়, সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক বন্ধুত্বে রূপান্তরিত হয়।