শহুরে শিশুদের গ্রামের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার জরুরি প্রয়োজন
প্রতিবছর দুই ঈদে শহর থেকে গ্রামে যাওয়া শিশুদের জন্য গ্রামের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা একটি অপরিহার্য বিষয়। গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা শহুরে শিশুদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় ত্রুটি হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
গ্রামীণ জীবনের অজ্ঞতা: একটি উদাহরণ
২০০৪ সালের একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য। ঢাকার মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির একজন মেধাবী শিক্ষার্থী, যাকে দেশের সেরা হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তার গ্রাম সম্পর্কে ধারণা ছিল অত্যন্ত সীমিত। সে তুলসীগাছ দেখেছে কেবল সিনেমায়, আলু গাছের অবস্থান সম্পর্কে তার ধারণা ছিল ভুল, এবং মরিচগাছকে সে আমগাছের সমান মনে করত।
এটি শুধু একটি শিশুর উদাহরণ নয়, বরং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ও অভিভাবকদের সংকীর্ণ চিন্তার প্রতিফলন। শহুরে শিশুরা প্রায়ই গ্রামীণ জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বেড়ে উঠছে, যা তাদের সামগ্রিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে।
গ্রামের গুরুত্ব ও শিক্ষার সুযোগ
গ্রাম হলো সীমাহীন শেখার একটি অনন্য ক্ষেত্র, যা শহুরে শিশুদের জন্য জীবনমুখী বাস্তব শিক্ষালয় হিসেবে কাজ করতে পারে। ঈদের ছুটিতে গ্রামে গিয়ে শিশুরা নানা ধরনের শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে:
- সাঁতার শেখা: মার্চ মাসে পুকুর ও নদীতে পানি কম থাকায় ঈদের ছুটি সাঁতার শেখার জন্য আদর্শ সময়।
- গাছ রোপণ: শিশুদের নিজ হাতে গাছ লাগানো ও পরিচর্যা করার মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়।
- আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতি: আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা, লোককাহিনি শোনা এবং স্থানীয় শিল্পীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
- প্রকৃতির সান্নিধ্য: খালি পায়ে হাঁটা, কাদাপানিতে খেলা, মাছ ধরা এবং গ্রামীণ খেলায় অংশগ্রহণ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়ক।
অভিভাবকদের ভূমিকা
শহুরে অভিভাবকদের উচিত শিশুদের গ্রামের সঙ্গে পরিচয় করানো এবং তাদের বাস্তব শিক্ষায় উৎসাহিত করা। গ্রামে গিয়ে ব্যস্ততা সত্ত্বেও শিশুদের জন্য সময় বের করে নিম্নলিখিত কাজগুলো করা যেতে পারে:
- গ্রাম্য মেলায় শিশুদের নিয়ে যাওয়া।
- ধান রোপণ, মাছ ধরা ও সবজি তোলার মতো কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা দেওয়া।
- স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানানো।
যাদের গ্রামে বাড়ি নেই, তাদেরও শিশুদের গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে পরিচয় করানোর দায়িত্ব রয়েছে। স্কুল-কলেজের তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি এই বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা শিশুদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক, যেখানে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষার অভাব প্রকট। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে প্র্যাকটিক্যাল অংশটি প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে, যা শিশুদের গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে অজ্ঞতা বাড়িয়ে তোলে। পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
শিশুরা যেন ঈদের ছুটির জন্য উৎসুক হয়ে ওঠে এবং গ্রামে তাদের সমবয়সীদের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনা করে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গ্রামকে জানা ও বুঝার মাধ্যমে তারা একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
লেখক: তুহিন ওয়াদুদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং রিভারাইন পিপলের পরিচালক। মতামত লেখকের নিজস্ব।



