নেত্রকোনায় টিম রনির উদ্যোগে অসহায়দের মাঝে ইফতারি বিতরণ, জনসেবার নানা কর্মসূচি
নেত্রকোনায় টিম রনির ইফতারি বিতরণ ও জনসেবা

নেত্রকোনায় টিম রনির উদ্যোগে অসহায়দের মাঝে ইফতারি বিতরণ

নেত্রকোনা সদর উপজেলায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন টিম রনির উদ্যোগে অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে ইফতারি বিতরণ করা হচ্ছে। গতকাল শনিবার শহরের রাজুর বাজার এলাকায় এই কর্মসূচি পালিত হয়। প্রতিদিন হাজারো হতদরিদ্র, ছিন্নমূল মানুষ ও পথচারীকে ইফতার করাচ্ছে এই সংগঠনটি। করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে প্রতি রমজান মাসে তারা এ কাজ করে আসছে।

ইফতারি বিতরণের বিস্তারিত প্রক্রিয়া

শহরের বিভিন্ন এলাকায় ইজিবাইক, ভ্যান ও পিকআপ ভ্যানে করে স্বেচ্ছাসেবীরা রোজাদার ব্যক্তিদের মধ্যে প্যাকেটে করে ডিম-খিচুড়ি, খেজুর, জিলাপি, ছোলা, পেঁয়াজু ও মুড়ি বিলিয়ে দিচ্ছেন। সঙ্গে থাকে একটি করে পানির বোতল। স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২০ সালে করোনা শুরুর পর শহরের ৯টি ওয়ার্ডে অসহায় ও ছিন্নমূল মানুষদের সহযোগিতার লক্ষ্যে ‘টিম রনি’ নামে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন আবদুল্লাহ আল মামুন খান (রনি)।

চকপাড়া এলাকার এই বাসিন্দা শুরুতে ২৫ জন সদস্য নিয়ে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে সদস্যসংখ্যা বেড়ে ৫১ জন হয়েছে এবং তিনজন উপদেষ্টাও আছেন। এসব সদস্যের সহযোগিতায় তারা শুধু প্রতিবছর ইফতারের আয়োজনই নয়; শীতার্ত মানুষদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ, বিভিন্ন দুর্যোগে অসহায় মানুষদের সহযোগিতা, মুমূর্ষু রোগীকে রক্তদান, অসহায়দের চিকিৎসা, এতিম শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার খরচ, বৃক্ষরোপণ, শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে নালা পরিষ্কার, ভাঙা রাস্তা সংস্কার, নদী থেকে কচুরিপানা অপসারণসহ বিভিন্ন ধরনের জনসেবামূলক কাজ করে থাকেন।

ইফতারি প্রস্তুতির দৃশ্য

গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে চকপাড়া এলাকায় কোর্ট স্টেশনসংলগ্ন আবদুল্লাহ আল মামুনের বাসভবন চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, ছয়টি উনুনে বড় বড় ডেকচি বসানো। কোনোটাতে রান্না হচ্ছে খিচুড়ি, কোনোটাতে ডিম, আবার কোনোটিতে মোরগের মাংস। প্রায় ৩৫ জনের মতো স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। কেউ প্যাকেটে মুড়ি, ছোলা, খেজুর, পেঁয়াজু, জিলাপিসহ বিভিন্ন সামগ্রী ভরছেন।

স্বেচ্ছাসেবক রাজন মিয়া বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে আমাদের আয়োজন শুরু হয়। কেউ বাজার করেন, কেউ কাটা-বাটা করেন, কেউ রান্না করেন, কেউ প্যাকেট করেন। সম্মিলিতভাবে এই কাজ বিকেল সাড়ে পাঁচটার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। তারপর রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক ও ছোট পিকআপে বিভিন্ন স্থানে পরিবহন করে ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।’

বাবুর্চি ও সুবিধাভোগীদের প্রতিক্রিয়া

বাবুর্চি মো. আকবর মিয়া বলেন, ‘বাবুর্চি আবদুস সালামসহ চারজন সহযোগী নিয়ে রান্না করি। টানা ছয় বছর ধরে প্রতি রোজায় এই ইফতারি তৈরি করি। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে চুলা জ্বালিয়ে চারটার মধ্যে শেষ করা হয়। রোজাদারদের খেদমত করে তৃপ্তি পাই। তাঁরা যে টাকা দেন, আমরা তা পেয়েই খুশি। এইডা পারিশ্রমিক না সম্মানী।’

পৌরসভার সাতপাই গাড়া রোড এলাকা থেকে শহরের রাজুর বাজার মোড় এলাকায় ইজিবাইক নিয়ে এসেছেন রফিকুল ইসলাম (৪৮)। ইফতারের সময় হয়ে গেছে। কোথায় ইফতার করবেন তা ভাবছিলেন রফিক। যাত্রী নামানোর সময় তাঁর চোখে পড়ে ইফতারি বিতরণের দৃশ্য। পরে সড়কের পাশে ইজিবাইক রেখে সেখানেই তিনি ইফতার করেন। রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আল্লাহই ইফতারির জোগাড় কইরা দিছেন। প্যাকেটে ডিম-খিচুড়ি, খেজুর, জিলাপি, ছোলা, মুড়ি সবই আছিল। পেট ভইরা খাইছি।’

ষাটোর্ধ্ব ভিক্ষুক মদিনা আক্তার বলেন, ‘তাদের ইফতারি আমরা প্রতিদিন চকপাড়া ইস্টিশনের কাছে গিয়া করি। গরিব মানুষ ইফতারি কিনতাম হারি না। তাই এইহানো আইয়া খাই। খাওনের মানও বালা। আমরার মতো মানুষের অনেক উপকার হয়।’

প্রতিষ্ঠাতার বক্তব্য

‘টিম রনির’ প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আল মামুন খান বলেন, ‘আমাদের সাধ আছে; কিন্তু সাধ্য নেই। তবুও চেষ্টা করি অসহায় রোজদার মানুষের জন্য একটু ইফতারি বিতরণের। প্রতিদিন ডিম মোরগ খিচুড়ির ইফতারি দেওয়া হয়। এর সঙ্গে থাকে নানা পদের ইফতারসামগ্রী। এই আয়োজনে সংগঠনের বাইরেও অনেকে স্বেচ্ছায় সহযোগিতা করেন। মানুষের কল্যাণে আমরা কাজ করতে আনন্দ পাই। আমার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাবেক সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিন খানের কাছ থেকে এসব জনকল্যাণমূলক কাজের উৎসাহ পাই।’

এই উদ্যোগটি নেত্রকোনা সদর এলাকায় সামাজিক সংহতি ও মানবিক সহায়তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। স্থানীয় সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণে টিম রনির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হচ্ছে, যা রমজান মাসে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর একটি অনন্য প্রচেষ্টা।