কখনো কি ভেবে দেখেছেন, যখন আপনি আপনার পরিবারের শিশু–কিশোরদের হাত থেকে স্মার্টফোন কেড়ে নেন, তখন সে মন খারাপ করে কেন? এটা কিন্তু শিশুটির দোষ নয়! এর কারণ, ডিভাইসটি এমনভাবে তৈরি করা, যা আমাদের অসংখ্য চাহিদা পূরণ করে থাকে।
মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক মাইকেলিন ডুকলেফ তাঁর নতুন বই ‘ডোপামিন কিডস’–এ বিষয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি বলেন, ‘অসংখ্য অভিভাবক আমাকে বলেছেন যে সন্তানদের প্রযুক্তির ব্যবহার কমানো প্রায় অসম্ভব। তবে প্রযুক্তির আসক্তির বৈশিষ্ট থাকা সত্ত্বেও কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়।’ এই লেখক নিজে তাঁর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অসংখ্য প্রযুক্তির ব্যবহার কমিয়েছেন। বলেন, তারপরই দেখবেন আপনার পরিবারে সুখ কীভাবে আরও বেড়ে যায়।
সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এ বিষয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন মাইকেলিন ডুকলেফ। সেটি বন্ধুসভার পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন তাহসিন আহমেদ।
ডোপামিন আসলে কী?
সিএনএন: অনেকেই মনে করেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে মস্তিষ্কের ডোপামিন নিঃসরণ হয়, যা আমাদের আনন্দ দেয়। কিন্তু আপনি বলছেন এটা সত্য নয়। কেন?
মাইকেলিন ডুকলেফ: এই ধারণা ১৯৫০-এর দশকের বিজ্ঞানের গবেষণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, যা গত ৩০ বছরে পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ডোপামিন আনন্দদায়ক হরমোন নয়। এটা আমাদের সুখের অনুভূতি দেয় না। নিউরোসায়েন্স আমাদের বলে যে এই হরমোন মূলত আমরা যে চাহিদা অনুভব করি, সেটা দেয়। বেঁচে থাকার জন্য কী লাগবে, ডোপামিন সিস্টেম সেটাই আমাদের তৈরি করে দেয় এবং বারবার এই কাজটা করে। গরমে পানি লাগবে, এটা সেই অনুভূতি। আমাদের মস্তিষ্কের অনুপ্রেরণা সিস্টেমে ডোপামিন যা কিছুই নিঃসরণ করে, আমরা সেটাকে অনেক বেশি মূল্যায়ন করি এবং বারবার এটা করতে চাই।
মূলত আমরা মানুষ হিসেবে যতই পরিণত হতে থাকি, যে কাজ আমাদের আনন্দ দেয়, সেই কাজটা বারবার করতে চাই। কিন্তু এই আধুনিক বিশ্বে আমাদের এমন কিছু কাজ রয়েছে, যেগুলো কষ্ট দেয় এবং খারাপ লাগার অনুভূতি তৈরি করে। এর মধ্যে অন্যতম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। আমি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দ্রুতই বন্ধ করে দিই। কেবল পাঁচ মিনিট ব্যবহার করলেও এটা আমার মধ্যে বিরক্তিকর অনুভূতি তৈরি করে। তবু আমি এটা চাই। গবেষণার সময় টিনএজাররাও একই কথা বলেছে। তারা এটা থেকে বের হতে চায়। তারা তাদের অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দিচ্ছে। এরপরও তারা পুরোপুরি বের হতে পারছে না। এটা এমন কিছু থেকে বের হওয়ার ইঙ্গিত, যা আপনাকে ভালো অনুভূতি দেয় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি শরীরের প্রতিক্রিয়া
সিএনএন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি আমাদের শরীর কেন এমন প্রতিক্রিয়া দেখায়?
মাইকেলিন ডুকলেফ: শিশুদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই চিন্তা ঢুকিয়ে দিচ্ছে যে তারা তাদের সামাজিক চাহিদা পূরণ করছে। এটা মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। এটা ছাড়া আমরা বাঁচতে পারব না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রতিশ্রুতি দিলেও সত্যিকার অর্থে তারা সেটা করছে না। গবেষণা দেখাচ্ছে, দীর্ঘ সময় ব্যবহারে শিশুদের মধ্যে একাকিত্বের অনুভূতির জন্ম নেয়।
শিশুদের দূরে সরানোর উপায়
সিএনএন: আপনি বলছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শিশুদের দূরে সরাতে। কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব?
মাইকেলিন ডুকলেফ: একটা উপায় হলো কীভাবে আপনি এই বিষয়গুলো ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করছেন। তবে এটি কাজ না–ও করতে পারে। কারণ, শিশুরা তখন এই নিয়ম মেনে নেবে না, চিল্লাবে। সন্তানের সঙ্গে আপনাকে একটা চুক্তিতে যেতে হবে। আচরণগত সাইকোলজি আমাদের বলে যে এটি কাজ করবে তখনই যখন আমরা কোনো কিছু কেবল কেড়ে না নিয়ে, বরং সেই জায়গা এমন কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপন করা, যেটা শিশুদের জন্য আনন্দদায়ক হবে।
উদাহরণ হিসেবে, সিদ্ধান্ত নিলাম এখন থেকে ডিনারের পর নেটফ্লিক্স বা ইউটিউব দেখা বন্ধ। প্রতিদিন এ বিষয়ে বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। তাই আমি আমার মেয়েকে ‘নো মোর নেটফ্লিক্স’ বলার পরিবর্তে বললাম, ‘আমি তোমাকে বাইরে নিয়ে যাব এবং এমন কিছু শেখাব, যেটার জন্য তুমি অনেক দিন ধরে চাচ্ছ। তোমাকে বাইক চালানো শেখাব।’
আমি কিন্তু তাকে বলিনি নিজের রুমে যাও এবং বিরক্ত অনুভব করো। জীবনে আরও ভালো কিছু আবিষ্কার করতে এবং রোমাঞ্চ পেতে আমি তাকে সহায়তা করছি। তাকে এমন দক্ষ করে গড়ে তুলতে চাচ্ছি, যেটায় সে ভালো অনুভব করবে ও আনন্দ পাবে। বসে বসে অ্যাডভেঞ্চার দেখার পরিবর্তে সেটা সে সত্যিকারভাবে অনুভব করুক।
বাড়ির ভেতরে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
সিএনএন: আপনি আপনার মেয়ের জন্য বাড়ির ভেতরে এমন জায়গা তৈরি করে দিয়েছেন, যেখানে সে আর্ট করতে পারে, হোমওয়ার্ক করতে পারে এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। কেন?
মাইকেলিন ডুকলেফ: গত ২০ বছরে আচরণগত সাইকোলজিস্ট ও স্নায়ুবিজ্ঞানীরা শিখেছেন—অভ্যাস পরিবেশ বা প্রেক্ষাপটের ওপর নির্ভর করে কাজ করে। একজন অভিভাবক হিসেবে, এমন কিছুর কাছে সন্তানদের নিয়ে যেতে হবে, যাতে সত্যিকার অর্থে তারা ভালো অনুভব করে। এ ক্ষেত্রে তাদের জন্য আমাদের সময় বের করতে হবে, জায়গা তৈরি করতে হবে, যেখানে একমাত্র অপশন হবে স্বাস্থ্যকর কিছু। আর অপশন যদি হয়—বই পড়া, আঁকাআঁকি করা, আর্ট করা, বাইক চালানো অথবা বন্ধুর বাড়িতে যাওয়া; তাহলে তখন তাদের মস্তিষ্ক এমন ডোপামিন তৈরি করবে, যার কারণে তারা এ ধরনের অফলাইন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে উৎসাহ পাবে।
আমি আমার বাড়িতে এবং জীবনে এ ধরনের জায়গাগুলো তৈরি করেছি, যাতে আমার মেয়ে জানে যে তার জন্য ঠিক কোন অপশনগুলো রয়েছে। আর অধিকাংশ সময় একটি ডিভাইস এই অপশনের মধ্যে পড়ে না। আমি ডোপামিনের বিরুদ্ধে না গিয়ে, বরং আমার পক্ষে কাজ করাতে ব্যবহার করি।
হোমওয়ার্কের জন্য স্ক্রিন প্রয়োজন?
সিএনএন: হোমওয়ার্ক করার জন্য যদি বাচ্চাদের মুঠোফোনের স্ক্রিনের প্রয়োজন হয়?
মাইকেলিন ডুকলেফ: যখন আমি সকালে লেখালেখি করি, তখন একটি ব্লকার ব্যবহার করি। এটি আমার জন্য সব অপ্রয়োজনীয় ওয়েবসাইট ব্লক করে রাখে। আমার বয়স ৫০, সঙ্গে একটি ডক্টরেট ডিগ্রি এবং আমাকে ব্লকার ব্যবহার করতে হয়। তাই একজন ১৫ বছরের বাচ্চার জন্য হোমওয়ার্ক করার সময় ব্লকার ব্যবহার না করার সুযোগ নেই। আমি মনে করি একজন অভিভাবক হিসেবে এটা আমাদের দায়িত্ব যে সন্তানদের বলা, ‘এই বিষয়গুলো ইচ্ছাকৃতভাবেই এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে তোমার হোমওয়ার্ক করার সময় ক্ষতি করা যায়। চলো এমন পরিবেশ তৈরি করি, যাতে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাজটি করতে পারো।’
ছোট পরিবর্তন, স্থায়ী ফল
সিএনএন: আপনি বলছেন, একসঙ্গে অনেকগুলো পরিবর্তন না আনতে?
মাইকেলিন ডুকলেফ: আধুনিক আচরণগত সাইকোলজি বলছে, আমরা এমন ছোট পরিবর্তন করতে চাই, যেটা স্থায়ী হবে। তাই চলুন শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিই, শুক্রবার ডিনারের পর কোনো স্ক্রিনটাইম হবে না। এর পরিবর্তে তখন খেলার জন্য সময় বের করা যেতে পারে, যদি সেটা আপনার সন্তানকে আনন্দ দেয়। সন্তান সেটা শিখবে এবং একটা সময়ে শুক্রবারে ডিনারের পর স্ক্রিনটাইম চাওয়া বন্ধ করে দেবে। তারপর আপনি পরবর্তী ধাপে যেতে পারেন। শুক্রবারের সঙ্গে শনিবারও এই নিয়ম করে দিলেন।
অভিভাবকের প্রভাব
সিএনএন: আপনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সন্তানেরা কী করবে এবং কী চিন্তা করবে, সেটার ওপর অভিভাবক হিসেবে আমাদের অনেক প্রভাব রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সেরা উপায় কী?
মাইকেলিন ডুকলেফ: আমার মনে হয় সবচেয়ে বড় যে ভুলটা হয় তা হলো—কীভাবে এ বিষয়ে আমরা কথা বলি। আমাদের কথা বাচ্চাদের জন্য অনেক শক্তিশালী। আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্ক্রিনটাইম ও ভিডিও গেমসের মতো বিষয়গুলোকে জীবনের অর্জন বলে মূল্যায়ন করি, কঠোর পরিশ্রমের ফসল হিসেবে। এর মধ্য দিয়ে কিন্তু বাচ্চারা এসব বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমার মনে হয় বিষয়টাকে উল্টোভাবে দেখা উচিত। যদি আমরা এমন বিষয়ের মূল্যায়ন করি, যেটা আমাদের বাচ্চাদের জন্য ভ্যালু তৈরি করবে; যেমন তাদের ভালো বন্ধু হওয়া।
প্রযুক্তি কমানোর সুফল
সিএনএন: আপনি প্রযুক্তির অসংখ্য ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। জীবনে কী কী পরিবর্তন হলো?
মাইকেলিন ডুকলেফ: আমি ঠিক বলতে পারব না কতটা ভালো। স্ক্রিনটাইম কমিয়ে দেওয়ার ফলে আমাদের পারিবারিক জীবন খুবই ইতিবাচকভাবে বদলে গিয়েছে। রাত অনেক নীরব ও শান্ত হয়ে গেছে এবং আশ্চর্যজনকভাবে আরও বেশি আনন্দদায়ক। এখন সন্ধায় স্ক্রিনটাইম নিয়ে আমাদের মধ্যে আর ঝগড়া হয় না। আমার মেয়ে রোজি, অডিওবুক শোনা, বাড়ির পাশে বন্ধুদের সঙ্গে বাইক চালানোসহ নানা কর্মকাণ্ডে নিজেকে ব্যস্ত রাখছে। পাশাপাশি রাতে ঘুমানো আরও সহজ হয়ে গেছে। আমরা এখন খুবই ভালো এবং লম্বা সময় ঘুমাতে পারি। আর এই পরিবর্তন আমাদের মানসিক অবস্থার ব্যাপক উন্নতি ঘটিয়েছে। আমরা এখন অনেক বেশি হাসতে পারি—খাওয়ার সময়, সন্ধ্যায়, গাড়িতে। জীবনে অনেক বেশি আনন্দ এখন।



