মধ্যপ্রাচ্য সংকটে দুবাই: বাসিন্দারা পোষা প্রাণী ফেলে পালাচ্ছেন, আশ্রয়কেন্দ্র উপচে পড়ছে
দুবাইয়ে সংকটে পোষা প্রাণী ফেলে পালাচ্ছেন বাসিন্দা

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে দুবাই: পোষা প্রাণী ফেলে পালাচ্ছেন বাসিন্দারা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের প্রভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহর থেকে বাসিন্দারা তাড়াহুড়ো করে দেশ ছাড়ছেন। এই দ্রুত প্রস্থানের সময় তারা তাদের পোষা প্রাণীগুলোকে রাস্তায় ফেলে যাচ্ছেন, যা একটি বড় মানবিক ও প্রাণী কল্যাণ সংকট তৈরি করেছে। পশু চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সংকট তীব্র হওয়ার সাথে সাথে পোষা প্রাণীদের 'ইউথ্যানেশিয়া' বা ব্যথামুক্তভাবে মেরে ফেলার অনুরোধও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।

পরিসংখ্যান ও পরিত্যাগের মাত্রা

সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোট পোষা প্রাণীর সংখ্যা ২০ লাখেরও বেশি, যেখানে দুবাইয়ে বিশেষভাবে বিড়ালের সংখ্যা কুকুরের চেয়ে দ্বিগুণ। প্রায় ৬৪.৯৮ শতাংশ পোষা প্রাণীর মালিক বিড়াল পালেন। দুবাইয়ে কুকুর পুনর্বাসনে কাজ করা সংগঠন 'কে-নাইন ফ্রেন্ডস দুবাই' জানিয়েছে, পোষা প্রাণী ফেলে যাওয়ার খবর এখন 'উপচে পড়ছে'। একইভাবে, পোষা প্রাণী বোর্ডিং সেবা 'দ্য বার্কিং লট' স্বীকার করেছে যে তারা যতটা সম্ভব নমনীয় থাকার চেষ্টা করলেও আশ্রয়কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণ ভরে গেছে।

আশ্রয়কেন্দ্র ও স্বেচ্ছাসেবকদের সংগ্রাম

পশু উদ্ধার আশ্রয়কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবকরা বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কয়েকশো বেশি পোষা প্রাণী এখন তাদের কাছে আসছে। কিছু আশ্রয়কেন্দ্র আর সব প্রাণীর যত্ন নিতে পারছে না। একজন স্বেচ্ছাসেবক উল্লেখ করেছেন, খুঁটির সাথে বাঁধা কুকুরের হৃদয়বিদারক ছবি হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুক গ্রুপে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, এমন দুইশোরও বেশি পোস্ট তিনি নিজে দেখেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মরুভূমি ও সীমান্তে পরিত্যাগ

ওমানের পথে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করা কিছু বাসিন্দা পোষা প্রাণী সীমান্ত পার করতে না পেরে মরুভূমিতে ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। আল আইনের এক বাসিন্দা তার দরজায় চার বাচ্চাসহ একটি বিড়াল পেয়েছেন, যার সাথে মালিকের একটি চিঠি ছিল। চিঠিতে লেখা ছিল, 'বাচ্চা ৪টি ও মা বিড়াল বাক্সের ভেতরে আছে। আমি পরিস্থিতির কারণে দেশে ফিরে যাচ্ছি। ফোন করার চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু কেউ ধরেননি। তাই আপনার ঠিকানা খুঁজে বের করলাম। আপনার গেটের সামনে রেখে যাওয়ার জন্য অনেক দুঃখিত।'

পশু অধিকার সংগঠনের প্রতিক্রিয়া

পশু অধিকার সংগঠন 'ওয়ার পজ' বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ধনী দেশে এই মাত্রার পরিত্যাগ অকল্পনীয়। সংগঠনের প্রধান লুইস হেস্টি বলেন, 'এটা শুধু সেখানে নয়, ইরাক ও ইউক্রেনেও হচ্ছে। কেউ কেউ পোষা প্রাণীকে আমাদের মতো করে দেখেন না।' হেস্টি নিজে চলমান সংঘাতের কারণে ইরাকে আটকে আছেন, কিন্তু তিনি তার উদ্ধার করা প্রাণীদের সাথেই থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সমালোচনা ও সামাজিক মাধ্যমের ক্ষোভ

সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনা ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অনেক প্রবাসী বিলাসবহুল ও করমুক্ত জীবনের আশায় 'বিশ্বের নিরাপদতম শহর' হিসেবে পরিচিত দুবাইয়ে বসবাস করতেন, কিন্তু বিপদের সময় পোষা প্রাণী ফেলে যাওয়ায় ইন্টারনেটে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। এক্স-এ একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, 'দুবাইয়ে যারা থাকেন তাদের অনেকেই অসার ও আত্মাহীন। যে প্রাণীদের নিজেরা পোষ মানিয়েছে তাদের ফেলে যাওয়া মানুষরাই পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণ্য জীব।'

স্থানান্তর সংকট ও প্রযুক্তিগত সমাধান

অনেক প্রবাসী বিমানে আসন বুকিং না পেয়ে বা স্থানান্তরের খরচ বহন করতে না পেরেও পোষা প্রাণী ফেলে যাচ্ছেন। দুবাইয়ের পোষা প্রাণী স্থানান্তর সংস্থা 'পজম পেটস'-এর প্রতিষ্ঠাতা কিরস্টি কাভানা জানিয়েছেন, গত তিন দিনে তাদের কাছে জমা পড়া অনুসন্ধান ২,০০০ শতাংশ বেড়ে গেছে। এদিকে, দুবাই মিউনিসিপ্যালিটি সম্প্রতি রাস্তার প্রাণীদের খাওয়ানোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত স্মার্ট যন্ত্র 'এহসান স্টেশন' চালু করেছে, যা ১২টি যন্ত্রের মাধ্যমে রাস্তার প্রাণী শনাক্ত করে খাবার দেবে।