লোহাগাড়ায় সরকারি টিলা অবৈধভাবে কাটার ঘটনা: প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিফলন
লোহাগাড়ায় সরকারি টিলা অবৈধভাবে কাটা: পরিবেশ হুমকি

লোহাগাড়ায় সরকারি টিলা অবৈধভাবে কাটার ঘটনা: পরিবেশ ও আইনের শাসন হুমকির মুখে

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা ইউনিয়নে অবস্থিত 'কালুনির বর পাহাড়' নামের একটি সরকারি টিলা ধাপে ধাপে কেটে ফেলা হচ্ছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাতের আঁধারে ভেকু দিয়ে টিলার মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই টিলার প্রায় ২০ শতক অংশ ইতিমধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে, যা স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের লঙ্ঘন ও প্রশাসনিক দুর্বলতা

এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি এলাকার পরিবেশ ধ্বংসের খবর নয়, বরং এটি আমাদের প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং আইনের শাসনের সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, সরকারি বা বেসরকারি মালিকানাধীন পাহাড় ও টিলা কর্তন বা মোচন করা যাবে না, যদি না জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজন হয় এবং সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের ছাড়পত্র থাকে। তবে, এই ক্ষেত্রে এমন কোনো ছাড়পত্রের তথ্য নেই। তবুও প্রায় এক বছর ধরে ধাপে ধাপে টিলা কাটা চলছে, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্রের উপর প্রভাব

এই টিলাটি ফলদ, বনজ ও ভেষজ গাছপালায় আচ্ছাদিত ছিল এবং এটি স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করছিল। লোকালয় থেকে দূরে নির্জন এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এটি প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল। একটি টিলা কেটে ফেলা মানে শুধু কিছু মাটি সরানো নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রকে ধ্বংস করা। এটি জলাধার সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড় কাটার ইতিহাস ও বর্তমান পরিস্থিতি

বাংলাদেশে, বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলে, পাহাড় ও টিলা কাটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। অতীতে অসংখ্য পাহাড় কেটে বসতি ও স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে, যার ভয়াবহ পরিণতি আমরা বারবার প্রত্যক্ষ করেছি। এই ঘটনার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো প্রশাসনের নজরদারির ঘাটতি। প্রায় এক বছর ধরে যদি একটি সরকারি টিলা অবৈধভাবে কাটা হয়, তবে স্থানীয় প্রশাসন, ভূমি অফিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কীভাবে তা অজানা থাকে, তা একটি গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

অভিযোগ ও তদন্তের প্রয়োজনীয়তা

স্থানীয় এক ব্যক্তির দখল ও তত্ত্বাবধানে টিলা কাটার অভিযোগ উঠেছে, যদিও তিনি তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রশাসনের দায়িত্ব, তবে তদন্ত যেন কাগজে–কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। দ্রুত সরেজমিন অভিযান, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে, অবৈধভাবে কাটা অংশে পুনরায় বনায়ন ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি ও সমাধানের আহ্বান

স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি মেনে নেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। লোহাগাড়ার এই ঘটনার দ্রুত ও দৃশ্যমান সমাধান হওয়া জরুরি, অন্যথায় এটি আরও অনেক এলাকায় একই ধরনের অনিয়মকে উৎসাহিত করতে পারে। প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী দ্রুত অভিযান ও আইনি পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে সেটিই হবে প্রকৃত বার্তা যে, পরিবেশ রক্ষায় শূন্য সহনশীলতার নীতি কেবল ঘোষণায় নয়, প্রয়োগেও প্রতিফলিত হতে হবে।