মাঝেমধ্যেই আকাশে একসঙ্গে বেশ কিছু বিদ্যুৎ চমকাতে দেখে আমরা অবাক হই। কিন্তু পৃথিবীতে বজ্রপাত আসলে কতটা সাধারণ ঘটনা? বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন প্রায় ৮০ লাখেরও বেশিবার বজ্রপাত হয়। একে যদি আমরা সময়ের মাপে ভাগ করি, তবে দেখা যায়; প্রতি সেকেন্ডে গড়ে প্রায় ৯৩ বার পৃথিবীর কোথাও না কোথাও বিজলি চমকাচ্ছে। অর্থাৎ, চোখের পলক ফেলার আগেই পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে অনেকবার বজ্রপাত হয়ে যায়!
সূর্যের চেয়েও পাঁচ গুণ বেশি উত্তপ্ত
বজ্রপাত কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তা এর তাপমাত্রার হিসাব শুনলেই বোঝা যায়। একটি বজ্রপাতের তাপমাত্রা প্রায় ৫০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট (২৭ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত হতে পারে। জানলে অবাক হবেন, এটি সূর্যের পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রার চেয়েও প্রায় পাঁচ গুণ বেশি! আকাশ থেকে যখন এই প্রচণ্ড উত্তপ্ত বিদ্যুৎ পৃথিবীতে নেমে আসে, তখন চারপাশের বাতাস মুহূর্তেই উত্তপ্ত হয়ে বিস্ফোরিত হয়। তা থেকেই আমরা সেই কান ফাটানো বজ্রপাতের শব্দ শুনতে পাই।
ঝড়ের পরের সময়টা কেন বেশি বিপজ্জনক
আমরা মনে করি, ঝড় থেমে গেলেই বুঝি সব বিপদ শেষ। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, মারাত্মক আবহাওয়া শান্ত হওয়ার পরের সময়টাই অনেক ক্ষেত্রে বেশি প্রাণঘাতী হয়। ঝড়ে উপড়ে পড়া গাছ, ছিঁড়ে পড়ে থাকা বিদ্যুতের তার কিংবা বন্যার পানিতে ডুবে থাকা ভাঙা কাচ ও ধারালো বস্তু বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এ ছাড়া মানুষের অস্থিরতার কারণে এই সময়ে সড়ক দুর্ঘটনাও অনেক বেড়ে যায়। তাই ঝড় থামার পরপরই তাড়াহুড়ো করে বের হওয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
বজ্রঝড়ের সময় গোসল করা মানা কেন
বজ্রপাতের সময় ঘরের ভেতরে থাকা নিরাপদ। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আপনি তখন নিশ্চিন্তে গোসল করতে পারবেন। বজ্রপাত যদি বাড়িতে বা আশপাশে আঘাত করে, তবে সেই বিদ্যুৎ পানির পাইপের মাধ্যমে বাথরুমে পৌঁছে যেতে পারে। পানি ও ধাতব পাইপ দুটোই বিদ্যুত সুপরিবাহী। এ কারণে ঝড়ের সময় গোসল করা, থালাবাসন ধোয়া বা হাত-মুখ ধোয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। এমনকি ইনডোর সুইমিংপুলগুলোও এই একই কারণে ঝড়ের সময় বন্ধ রাখা হয়।
ঝড় আসার আগে গাছের পাতা উল্টে যায় কেন
বড়রা অনেক সময় বলেন, গাছের পাতা উল্টে যেতে দেখলে বুঝবে ঝড় আসছে। শুনতে কুসংস্কার মনে হলেও এই প্রচলিত ধারণাটির পেছনে বিজ্ঞান রয়েছে। ঝড় আসার ঠিক আগে বাতাসে জলীয় বাষ্প বা আর্দ্রতার পরিমাণ হঠাৎ অনেক বেড়ে যায়। বাতাসের এই বাড়তি আর্দ্রতা গাছের পাতার ডাঁটাগুলোকে নরম করে দেয়। স্বাভাবিক অবস্থায় পাতার ডাঁটাগুলো যে পরিমাণ শক্ত থাকে, আর্দ্রতা বাড়লে সেগুলো সেই দৃঢ়তা হারিয়ে ফেলে। ফলে ঝড়ের দমকা বাতাস যখন পাতায় আঘাত করে, তখন নরম হয়ে যাওয়া পাতাগুলো সহজেই উল্টে যায়। তাই বাগানের গাছের পাতাগুলো যদি হঠাৎ সাদাটে বা উল্টো দেখায়, তবে বুঝে নেবেন ঝড় আসছে।
বৃষ্টি ছাড়াই কি বজ্রপাত হতে পারে
আমাদের ধারণা, বৃষ্টি শুরু হলেই বুঝি বিজলি চমকাবে। কিন্তু বজ্রপাতের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো, এর জন্য সব সময় বৃষ্টির প্রয়োজন হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১০ শতাংশ বজ্রপাত এমন সময়ে ঘটে, যখন কোনো বৃষ্টিই হচ্ছে না! আকাশ পরিষ্কার থাকলেও অনেক দূরে তৈরি হওয়া মেঘ থেকে বজ্রপাত কয়েক মাইল পথ পাড়ি দিয়ে আপনার আশপাশে আছড়ে পড়তে পারে। তাই মেঘের গর্জন শুনলে বৃষ্টি আসার অপেক্ষায় না থেকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
বিমানের কেন বারবার বজ্রপাত হয়
আকাশে ওড়ার সময় একটি বিমান বছরে গড়ে অন্তত একবার বজ্রপাতের শিকার হয়। শুনতে ভয়ংকর মনে হলেও আধুনিক বিমানগুলো এমনভাবে তৈরি, এতে যাত্রীদের কোনো ক্ষতি হয় না। ১৯৮০ সালে নাসা প্রায় দেড় হাজার বজ্রঝড়ের ভেতর দিয়ে একটি বিমান চালিয়েছিল। সে সময় বিমানটি ৭০০ বারের বেশি বজ্রপাতের কবলে পড়েছিল! এই পরীক্ষার মাধ্যমেই বিজ্ঞানীরা বিমানে বজ্রপাত প্রতিরোধের উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবণ করেন। ফলে গত কয়েক দশকে বজ্রপাতের কারণে বড় কোনো বিমান দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
পা দুটো কেন একসঙ্গে রাখবেন
বজ্রঝড়ের সময় যদি কোনো নিরাপদ আশ্রয় না পান, তাহলে পায়ের পাতা দুটি একে অপরের সঙ্গে ঠেকিয়ে রাখুন বা জোড়া করে রাখুন। বজ্রপাতে যত মানুষ মারা যায়, তার অর্ধেকই ঘটে মাটির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুতের কারণে। পা দুটো আলাদা থাকলে এক পা দিয়ে বিদ্যুৎ ঢুকে অন্য পা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় শরীরের ভেতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু পা একসঙ্গে থাকলে বিদ্যুৎ শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ কম পায়। তাই এই সময়ে গাছের নিচে না দাঁড়িয়ে নিচু হয়ে বসে পড়ুন ও পা দুটো একসঙ্গে রাখুন।
একই জায়গায় কি দুবার বজ্রপাত হয়
অনেকেই মনে করেন, বজ্রপাত একই জায়গায় দুবার পড়ে না। কিন্তু এটি একদম ভুল ধারণা। আসলে বজ্রপাত একই জায়গায় বারবার পড়তে পারে। বিশেষ করে সেটি যদি উঁচু বা সুচালো কোনো বস্তু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ে বছরে গড়ে প্রায় ১০০ বার বজ্রপাত হয়!
ঝড়ের আগেই কেন পাখিরা পালিয়ে যায়
পাখিরা মানুষের চেয়ে অনেক সূক্ষ্ম সংকেত বুঝতে পারে। ২০১৩ সালে বিজ্ঞানীরা দেখেন, টেনেসির পাহাড় থেকে গোল্ডেন-উইংড ওয়ারব্লার পাখিরা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে। অথচ তখন সেখানে বৃষ্টির কোনো চিহ্ন ছিল না। এমনকি বাতাসের গতিও ছিল স্বাভাবিক। মজার ব্যাপার হলো, প্রায় ৫৬০ মাইল দূরে একটি ঝড় তৈরি হচ্ছিল। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বজ্রঝড়ের ফলে তৈরি হওয়া খুব নিচু কম্পাঙ্কের শব্দ বা ইনফ্রাসাউন্ড পাখিরা আগেভাগেই শুনতে পায়। ঝড় শেষ হওয়ার পরই এরা আবার স্বাভাবিক চলাফেরা শুরু করে।
লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তা
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট এবং ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন



