বান্দরবানের দুর্গম আলীকদম-থানচি সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস ও কাঠ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ, ঝিরির পানিপ্রবাহ বন্ধ এবং শতবর্ষী মাতৃগাছ নির্বিচারে কাটার ফলে পুরো এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
বন উজাড়ের চিত্র
জানা যায়, জেলা সদর থেকে প্রায় ১২৭ কিলোমিটার এবং আলীকদম উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পামিয়া ম্রো পাড়া, তন্তুই পাড়া, নামচাক পাড়া, কাকই পাড়া, আদুই পাড়াসহ আশপাশের এলাকার প্রায় ২০০ একর জুড়ে এই বন উজাড় চলছে। আলীকদম-থানচি সড়কের ১৮ কিলোমিটার অংশ পাড়ি দিয়ে আরো প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে গেলে পোলা ব্যাঙ ঝিরি এলাকায় গিয়ে চোখে পড়ে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পোলা ব্যাঙ ঝিরির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে পাহাড় কেটে ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকারের গাছের গুঁড়ি। এলাকা থেকে প্রাকৃতিক বন থেকে কেটে নিয়ে যাচ্ছে গর্জন, চাম্পা ফুল গাছ, কড়ই, বৈলাম, গুটগুটিয়া, লালি গাছ, চাপালিশসহ নানা প্রজাতির গাছ।
পানিসংকট ও পরিবেশ বিপর্যয়
ব্যাঙ ঝিরি শুকিয়ে গেছে, পাঁচটি পাড়ার ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষ তীব্র পানিসংকটে দিন পার করছে। দুই বছর আগে বড় বড় গাছ ছিল, বন ছিল, বনের মধ্যে ভালুক, হরিণ, বন্যশূকরসহ নানা প্রজাতির বন্যপশুপাখি ভরপুর ছিল। এখন বনও নেই, পশুপাখিও নেই বলে জানায় স্থানীয়রা।
স্থানীয়রা জানান, এক্সকাভেটর দিয়ে প্রতিনিয়ত পাহাড় ভেঙে, কেটে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে এবং আলীকদম থেকে থানচি উপজেলায় যাওয়ার রাস্তার ২৩ কিলো নামক স্থান দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেকপোস্টকে পাশ কাটিয়ে কলার ঝিরি নামক বাইপাস রাস্তা ব্যবহার করে নিয়মিত কাঠ পাচার করা হচ্ছে।
অভিযোগ ও বক্তব্য
অভিযোগ রয়েছে, কাটা গাছের একটি অংশ বনবিভাগ কর্তৃক অনুমতিপত্র 'জোত পারমিট'-এর কাগজ দেখিয়ে বৈধতার আড়ালে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার করা হচ্ছে। অন্য অংশ আলীকদমের অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। মাতৃগাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে। এতে পুরো এলাকা এখন প্রায় বৃক্ষশূন্য হয়ে পড়েছে। বন উজাড়ে পানিসংকটসহ হারিয়ে গেছে বন্যপ্রাণী।
পামিয়া, তন্তুই, নামচাক, কাকই ও আদুই পাড়াসহ অন্তত পাঁচটি পাড়ার ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষ বিভিন্ন ঝিরির পানির ওপর নির্ভরশীল। বন উজাড় ও ঝিরির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন মারাত্মক পানিসংকট দেখা দিয়েছে। আদুই পাড়ার কার্বারী কামপ্লাত ম্রো বলেন, 'এই ব্যাঙ ঝিরির পানির ওপর সাত-আটটি পাড়া নির্ভরশীল। এখন আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি।' নামচাক পাড়ার মেন রাও ম্রো বলেন, 'দুই বছর আগেও এখানে হরিণ, ভালুক, বন্যশূকর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাস ছিল। এখন বনও নেই, প্রাণীও নেই।' পামিয়া পাড়ার মেন চং ম্রো বলেন, 'আগে ব্যাঙ ঝিরিতে প্রচুর পানি ও মাছ-কাঁকড়া ছিল। এখন পানি শুকিয়ে গেছে, আমরা এখন নিরাপদ পানির চরম সংকটে আছি।'
পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান চ্যাপ্টারের সভাপতি জোয়াম লিয়ান আমলাই বলেন, ইসমাইল নামের একজন অসাধু ব্যবসায়ী দুই বছর ধরে প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে কাঠ পাচার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রশাসনের বক্তব্য
তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় বন বিভাগের কার্যক্রম নেই। তবে অবৈধ কাঠ পাচারের ঘটনা ঘটলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, 'এ বিষয়ে আমি অবগত নই। আর পাড়াবাসীর কোনো আবেদন পাইনি।' প্রয়োজনে পুলিশ ফোর্স নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



