টাঙ্গাইলের বংশী নদীতে ইজারাদারের অবৈধ সড়ক, পানিপ্রবাহে বাধা ও টোল আদায়ের অভিযোগ
বংশী নদীতে ইজারাদারের সড়ক, পানিপ্রবাহে বাধা

টাঙ্গাইলের বংশী নদীতে ইজারাদারের সড়ক নির্মাণে পানিপ্রবাহে মারাত্মক বাধা

টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর ও বাসাইল উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বংশী নদীর পাথরঘাটা খেয়াঘাটে একটি বিতর্কিত ঘটনা ঘটছে। শুষ্ক মৌসুমে ইজারাদাররা নদীর ভেতর সড়ক তৈরি করে লোকজন ও যানবাহন পারাপার করান এবং টোল আদায় করেন। তবে বর্ষা মৌসুমে পানি আসার পরও এই সড়ক অপসারণ করা হয় না, যার ফলে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ঘাটের অবস্থান ও ইজারা ব্যবস্থা

বংশী নদীর পূর্ব প্রান্তে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার তরফপুর ইউনিয়নের পাথরঘাটা এবং পশ্চিম প্রান্তে বাসাইল উপজেলার সিংগারডাক গ্রাম অবস্থিত। পাথরঘাটা খেয়াঘাট নামে পরিচিত এই ঘাটটি জেলা পরিষদ প্রতি অর্থবছরে ইজারা দিয়ে থাকে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর ধরে মির্জাপুর উপজেলা বিএনপির সদস্য ও ব্যবসায়ী ইব্রাহিম খান এই ঘাট পরিচালনা করছেন। চলতি বছর জেলা পরিষদ ৭ লাখ ৩২ হাজার টাকায় তাঁর ছোট ভাই সুমন খানের নামে ঘাটটি ইজারা দিয়েছে।

সড়ক নির্মাণ ও টোল আদায়ের পদ্ধতি

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে নদীর পানি পুরোপুরি শুকিয়ে গেলে ইজারাদাররা নদীর ভেতর রাস্তা তৈরি করেন। এই রাস্তা দিয়ে পার হতে জনপ্রতি ১০ টাকা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ৩০ টাকা এবং জিপ, ট্যাক্সি ও মাইক্রোবাস থেকে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা টোল নেওয়া হয়। শুষ্ক মৌসুম শেষে নদীতে পানি এলেও সড়ক কেটে দেওয়া হয় না, বরং একটি পাকা কালভার্টও নদীর ভেতর তৈরি করে রাখা হয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মঙ্গলবার দুপুরে পাথরঘাটা খেয়াঘাটে সরেজমিনে দেখা যায়, ঘাটের দুই প্রান্তে ইজারাদারের নির্মিত সড়কটি জেগে আছে এবং মাঝখানে সড়ক উপচে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকা দিয়ে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে। যাত্রী পারাপারের দায়িত্বে থাকা মিন্টু মিয়া জানান, ১৫-২০ দিন আগে নদীতে পানি এসেছে এবং এর পর থেকে নৌকা দিয়ে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, শুষ্ক মৌসুমে রাস্তা তৈরি করে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার করা হয় এবং তখনও নৌকা দিয়ে পারাপারের মতো টোল আদায় করা হয়।

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া ও পরিবেশগত উদ্বেগ

সিংগাইরডাক গ্রামের বাসিন্দা আজিম উদ্দিন বলেন, "প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে তিন-চার মাস নদীতে রাস্তা তৈরি করে মানুষ পারাপার করা হয়।" একই গ্রামের আবুল কাশেম যোগ করেন, "শুকনা নদী দিয়ে পার হতে হলেও ১০ টাকা দিতে হয় এবং এর জন্য কোনো রসিদ দেওয়া হয় না।"

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সহিদ মাহমুদ এই ঘটনাকে গুরুতর পরিবেশগত অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "নদীতে বাঁধ দিয়ে বা রাস্তা নির্মাণ করে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা ঠিক নয়। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয় এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়। এটি একটি অপরাধ এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এদিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।"

ইজারাদার ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

ঘাট পরিচালনাকারী উপজেলা বিএনপির সদস্য ইব্রাহিম খান দাবি করেন, রাস্তাটি সেখানে সেতু নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে। তিনি বলেন, "অনেক টাকা দিয়ে ঘাটটি নেওয়া হয় এবং লোকসানের হাত থেকে রক্ষা পেতে শুষ্ক মৌসুমেও পারাপারে টোল আদায় করা হয়।"

টাঙ্গাইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রবিউল আওয়াল বলেন, "শুষ্ক মৌসুমে জনস্বার্থে কেউ রাস্তা তৈরি করলেও পানি আসার মৌসুমে তা সরিয়ে নেওয়া উচিত। কোনো অবস্থাতেই নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ব্যাহত করা যাবে না।"

মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খান সালমান হাবিব বিষয়টি সম্পর্কে জানিয়ে বলেন, "বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

এই ঘটনাটি টাঙ্গাইল জেলার পরিবেশ ও নদী ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে, যা স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছে।