রাশিয়ার যুদ্ধে প্রাণ হারালেন মৌলভীবাজারের মুহিবুর রহমান
রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়ে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আমতৈল ইউনিয়নের সম্পদপুর গ্রামের মুহিবুর রহমান। দালালের প্রলোভনে তিনি রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে যোগ দেন, যেখানে নাগরিকত্ব ও মোটা অঙ্কের বেতনের প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে তার স্বপ্ন নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায়।
পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া
মুহিবুর রহমানের মৃত্যুর খবরে তার পরিবারসহ সম্পদপুর গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। তিনি ছিলেন মসুদ মিয়া ও সুফিয়া বেগমের তৃতীয় সন্তান, যিনি তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে অবস্থান করতেন। পরিবারের একমাত্র আয়-উপার্জনের পথ ছিল মুহিবুর, যার মৃত্যু এখন তাদের জন্য ভয়াবহ আর্থিক সংকট ডেকে এনেছে।
মেক্সিকো থেকে রাশিয়া: একটি ট্র্যাজিক যাত্রা
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মুহিবুর রহমান ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে উচ্চশিক্ষার আশায় মেক্সিকোতে স্টুডেন্ট ভিসায় যান। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ভিসার মেয়াদ শেষ হলে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং প্রায় এক মাস অবস্থান করেন। এই সময়ে পারিবারিক সিদ্ধান্তে তিনি বিয়ে সম্পন্ন করেন। গত বছরের ৬ আগস্ট তিনি রাশিয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন, যেখানে পৌঁছানোর পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুএকবার ফোনে যোগাযোগ হয়েছিল। এরপর প্রায় চার মাস ধরে তার কোনো খবর পাওয়া যায়নি, যা পরিবারকে উদ্বিগ্ন করে তোলে।
শিক্ষাজীবন ও দালালের প্রলোভন
মুহিবুর রহমান নিজ এলাকায় চুরাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করেন। এরপর আমলৈ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে সিলেট এমসি কলেজে ভর্তি হন। পরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় মেক্সিকোতে স্টুডেন্ট ভিসায় যান। মেক্সিকোতে ভিসা মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তার জীবন হঠাৎ করেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে এবং এই সংকটময় সময়ে দালাল চক্র তাকে টার্গেট করে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ইকবাল আহমদ জানান, দালালরা মুহিবুরকে প্রলোভন দেখায় যে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিলে মোটা অঙ্কের বেতন ও যুদ্ধ শেষে নাগরিকত্ব মিলবে। ভবিষ্যতের আশায় তিনি সেই প্রলোভনে সাড়া দেন এবং রাশিয়ায় গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। তাকে সম্মুখ যুদ্ধে পাঠানো হয়, যেখানে দীর্ঘদিন রুশ বাহিনীর হয়ে লড়াই করলেও শেষ রক্ষা হয়নি।
ড্রোন হামলায় মৃত্যু ও মরদেহ ফেরত আনার প্রচেষ্টা
ইকবাল আহমদ আরও জানান, মুহিবুর রহমান একটি বাংকারে অবস্থানকালে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় সেটি বিধ্বস্ত হলে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। যুদ্ধে রাশিয়ার সেনাদের জন্য খাবার সরবরাহকারী এক ব্যক্তির মাধ্যমে প্রথমে পরিবারের কাছে তার মৃত্যুর খবর পৌঁছায়, যদিও ঠিক কবে তিনি নিহত হয়েছেন তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সপ্তাহখানেক আগে মারা গেলেও ২১ এপ্রিল বিষয়টি জানাজানি হয় এবং পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়।
মৌলভীবাজার উপজেলা নির্বাহী অফিসার রাজিব হোসেন জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মুহিবুরের মৃত্যুর বিষয়টি তার পরিবারের কাছ থেকে জেনেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, মুহিবুরের মরদেহ দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হচ্ছে, যা পরিবারের জন্য সামান্য স্বস্তির আশা জাগিয়েছে।
এই ঘটনা বাংলাদেশিদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বহন করে, বিশেষ করে যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা বা কর্মসংস্থানের সন্ধানে যাচ্ছেন। দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে বিপজ্জনক পথ বেছে নেওয়ার আগে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। মুহিবুর রহমানের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকেই শোকসাগরে ভাসায়নি, বরং এটি সমগ্র সমাজের জন্য একটি বেদনাদায়ক শিক্ষা হিসেবে রয়ে গেছে।



