২৯ মে ২০২৬, সকাল ৭টা। ঢাকা থেকে ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার মধুগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হলো। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও বৃষ্টি হয়নি। কোরবানির ঈদের পরদিন হওয়ায় রাস্তাঘাটের আবর্জনা ধুয়ে যাওয়ার জন্য বৃষ্টি হলে ভালো হতো।
যাত্রাপথের দৃশ্য
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যাত্রায় আমি চালকের পাশের আসনে বসলাম, যাতে পথের প্রকৃতি ও উদ্ভিদ পর্যবেক্ষণ করতে পারি। ফেনী যেতে তিনটি বড় নদী—শীতলক্ষ্যা, মেঘনা ও গোমতী—পার হতে হয়। একসময় এসব নদীতে ফেরি চললেও এখন সেসব স্মৃতি। মেঘনা নদীকে আগের মতোই প্রাণবন্ত মনে হলো, কিন্তু শীতলক্ষ্যা নদীর অবস্থা উদ্বেগজনক—শিল্পবর্জ্যের দূষণে পানি কালচে হয়ে গেছে। গোমতী নদী কিছুটা ভরাট হলেও স্রোত টিকে আছে, তবে ব্যাপক বালু উত্তোলন নদীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা জাগায়।
ইটভাটার বিস্তার
কুমিল্লা অতিক্রম করে ‘হাইওয়ে ইন’-এ যাত্রাবিরতি নিয়ে ফেনী হয়ে সকাল ১০টায় ছাগলনাইয়া, তারপর বেলা ১১টায় মধুগ্রাম পৌঁছাই। পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে কৃষিজমিতে পরিবেশবিধ্বংসী ইটভাটার ব্যাপক বিস্তার চোখে পড়ে। ফেনী থেকে ছাগলনাইয়া হয়ে মধুগ্রাম পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশেও অসংখ্য ইটভাটা দেখা যায়। এসব ভাটার অনুমোদন আছে কি না জানি না, তবে উর্বর কৃষিজমির মাটি কেটে ইট তৈরি করা হচ্ছে, যা কৃষি ও পরিবেশ—উভয়ের জন্যই মারাত্মক ক্ষতির কারণ।
ময়লার ভাগাড় ও পরিবেশ দূষণ
ফেনী শহরের প্রবেশমুখে একটি উন্মুক্ত ময়লার ভাগাড় থেকে নির্গত দুর্গন্ধ ও দূষণে চলাচলের সময় প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসে। একই অবস্থা ছাগলনাইয়ার প্রবেশ ও বহির্গমন পথেও দেখা যায়। মহাসড়কের পাশে এ ধরনের উন্মুক্ত বর্জ্যভান্ডার কোনোভাবেই পরিবেশসম্মত নয়। মনে প্রশ্ন জাগে—পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থানীয় কর্মকর্তারা কি এসব বিষয়ে নজর দিচ্ছেন?
গাছপালার অবস্থা
ঢাকা থেকে পুরো পথে রাস্তার দুই পাশে প্রধানত রেইনট্রি, মেহগনি ও আকাশমণিগাছ দেখা যায়। মাঝেমধ্যে দু-একটি কদমগাছও চোখে পড়ে। বর্ষাকালে কদম ফুল ফোটার কথা, কিন্তু এবার গ্রীষ্মকালেই অধিকাংশ কদমগাছে ফুল দেখা যায়। চলন্ত গাড়ি থেকে ছবি তোলার চেষ্টা করলেও উপযুক্ত লেন্স না থাকায় ছবিগুলো সন্তোষজনক হয়নি।
কৈয়ারা দিঘি ও হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতি
বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কৈয়ারা দিঘি। জমিদার শমসের গাজী তাঁর মায়ের স্মৃতির উদ্দেশে প্রায় ২৩ একর আয়তনের এই দিঘি খনন করেছিলেন। শৈশবে যেভাবে দিঘিটি দেখেছিলাম, এখন আর সে রূপ নেই। উত্তর ও পশ্চিম পারে গুচ্ছগ্রাম গড়ে উঠেছে, যার জনসংখ্যা গত ৪০ বছরে বহুগুণ বেড়েছে। একসময় দিঘির পাড়ে নানা উদ্ভিদ ও পানিতে অসংখ্য জলচর পাখি দেখা যেত, এবার সেসবের দেখা মেলেনি। দিঘির পাড়ে এখন সারিবদ্ধ আকাশমণিগাছ। দক্ষিণ পারে দারোগাবাজার, যেখানে প্রতি শুক্র ও সোমবার হাট বসত, এবার শুক্রবার হওয়া সত্ত্বেও কোনো বাজার বসেনি। স্থানীয় লোকজনের মতে, মানুষ ক্রমে শহরমুখী হয়ে পড়েছে।
কৃষিজমির পরিবর্তন
আসরের নামাজের আগে বাড়ি ফেরার পথে লক্ষ করি, রাস্তার দুই পাশে যেখানে ধানখেত থাকার কথা, সেখানে অনেক জমি পতিত পড়ে আছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেল, এখন মূলত আমন ও বোরো ধানের চাষ হয়, আউশ ধান তেমন কেউ করে না। ৪০ বছর আগে মধুগ্রাম ছিল ধনে-ধান্যে ও ফসলে ভরা এক সুজলা-সুফলা জনপদ। এখন সেই প্রকৃতির অনেকখানি জায়গা দখল করে নিয়েছে ইটভাটা, মাটিকাটা জমি ও কংক্রিটের স্থাপনা। তবে বিভিন্ন স্থানে মুরগি ও গরুর খামার গড়ে উঠতে দেখা যায়, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখছে এবং প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করছে।
প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ
পরদিন সকালে ছেলেকে নিয়ে গ্রামের প্রকৃতি দেখতে বের হই। নানা প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল ভুতি জামগাছের আধিক্য। রাস্তার দুই পাশে মেন্দা, কুকুরচিতা, গর্জন, ধাতই, বড়মালা, বননারেঙ্গা, শীতলপাটি, বিষকাটালি, লাল বিষকাটালি, ছিটকি, কদম, করজ, মান্দার, পিটালি, বরুণসহ নানা বুনো উদ্ভিদ চোখে পড়ে। বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তেলিগর্জনের উপস্থিতি, যা এখানে থাকার কথা নয়। আমার ধারণা, পাহাড়ি ছড়ার স্রোতের সঙ্গে বীজ ভেসে এসে জন্ম নিয়েছে। একসময় এ এলাকায় প্রচুর কালোজামগাছ ছিল, কিন্তু এবার একটি কালোজামগাছও চোখে পড়েনি। ৪০ বছর আগে চারপাশ আম, জাম, কাঁঠালসহ নানা দেশীয় ফলের গাছে পরিপূর্ণ ছিল, এখন সেই স্থান দখল করে নিয়েছে মেহগনি, আকাশমণি, রেইনট্রির মতো বহিরাগত প্রজাতি।
ফেরার পথ
দুপুরে খাবার শেষে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিই। পথে ‘হাইওয়ে ইন’-এ যাত্রাবিরতি নিয়ে আসর ও মাগরিবের নামাজ আদায় করি। রাত আটটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পৌঁছে যাত্রার ইতি টানি।
ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত
এই সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, ফেনী থেকে মধুগ্রাম পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে কৃষিজমির ওপর ইটভাটার ক্রমবর্ধমান দখল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। উর্বর টপসয়েল কেটে ইট তৈরির ফলে জমিগুলো চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয়ত, মহাসড়কের ধারে ও জনপদের প্রবেশমুখে যত্রতত্র ময়লার ভাগাড় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। বিশেষ করে ফেনী ও ছাগলনাইয়ার প্রবেশ ও বহির্গমনপথের অবস্থা অত্যন্ত হতাশাজনক। পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এ অঞ্চলের পরিবেশ আরও বিপর্যস্ত হবে।
আমাদের ঐতিহাসিক জলজ ঐতিহ্যের অংশ কৈয়ারা দিঘিও অব্যবস্থাপনার কারণে ধ্বংসের মুখে। এখনো সময় আছে এর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। ইতিহাস, ঐতিহ্য, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সমন্বয়ে এ দিঘি একটি মূল্যবান সম্পদ; একে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না।
ফেনী-শুভপুর সড়কের উন্নয়নকাজ চলমান। একসময় এ সড়কের দুই পাশে দেশীয় প্রজাতির অসংখ্য ফুল ও ফলের গাছ ছিল। পুনরায় বৃক্ষরোপণের সময় যাতে বিপন্ন ও দেশীয় প্রজাতির গাছগুলো অগ্রাধিকার পায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। প্রয়োজনে উদ্ভিদবিদ ও পরিবেশবিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
ফেনী একটি ছোট জেলা হলেও প্রতিবছর পাহাড়ি বন্যার কারণে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তা সত্ত্বেও এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য এখনো সমৃদ্ধ। সঠিক পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন ও সচেতন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ অঞ্চলকে আরও সুন্দর, বাসযোগ্য ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করে তোলা সম্ভব। আমাদের সামান্য আন্তরিক প্রচেষ্টাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে।



