ছবি: ফ্রিপিক
দ্বিতীয় খলিফা হিসেব দায়িত্বগ্রহণের পর ওমর (রা.) যে দূরদর্শী নেতৃত্ব, আপসহীন প্রশাসনিক নীতি এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন, তা–ই এক কালজয়ী অর্থব্যবস্থার জন্ম দিয়েছিল। তাঁর অর্থব্যবস্থার চালিকা শক্তি ছিল খোদাভীতি।
তিনি মনে করতেন, অন্তরে আল্লাহর ভয় না থাকলে উম্মাহর কাজে স্বচ্ছতা আসবে না এবং হাশরের ময়দানে পাকড়াও হওয়ার চিন্তা না থাকলে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করা সম্ভব নয়। (ড. আলি মুহাম্মাদ সাল্লাবি, আদ-দাওলাতুল ইসলামিয়া ফি আসরিল খুলাফায়ির রাশিদিন, পৃষ্ঠা: ১২১-১২২, মাকতাবাতুল ইমান, বৈরুত, ২০০২)
একবার তিনি সাহাবি সালমান ফারসির কাছে জানতে চান, ‘আমি রাজা, না খলিফা?’ সালমান (রা.) উত্তরে বলেন, ‘আপনি রাষ্ট্র থেকে এক দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা) বা কমবেশি কর যা-ই আদায় করেন না কেন, তা যদি ঠিক খাতে খরচ না করেন, তবে আপনি খলিফা নন, রাজা।’এ কথা শুনে তিনি কেঁদে ফেলেন। (ড. তহা হুসাইন, আশ-শাইখান আবু বাকার সিদ্দিক ওয়া উমার ইবনুল খাত্তাব, পৃষ্ঠা: ২৫৭, দারুল মাআরিফ, মিসর, ১৯৫৭)
তাই ব্যক্তি জীবনে তিনি খুব সতর্ক থাকতেন এবং সাধারণ জীবনযাপন করতেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘আমি ওমরকে চৌদ্দ তালিবিশিষ্ট কোমরবন্ধনী পরতে দেখেছি, যার কোনো কোনো তালি ছিল চামড়ার। তাঁর শরীরে রাজকীয় জামা বা আলখাল্লা থাকত না। (ইবনে সাআদ, তাবাকাতুল কুবরা, ৩/৩৩০, দারুস সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)
তিনি যোগ্যতম লোকদের প্রশাসক পদে নিয়োগ দিতেন এবং তাঁদের কর্মকাণ্ডে কড়া নজর রাখতেন। সৎ ও দায়িত্বশীলদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি দুর্নীতিতে ধরা পড়লে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দিতেন।
রাষ্ট্রীয় কোষাগারের তদারকি
একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি সচল রাখতে ওমর (রা.) কেন্দ্রীয় কোষাগারের (বায়তুল মাল) ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। কর ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনিমত) যথাযথ বণ্টন এবং জনগণের অর্থ সঠিকভাবে খরচ করার বিষয়ে তিনি সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন।
দূরদূরান্তের মুসলিম এলাকার জন্য তিনি যোগ্যতম লোকদের প্রশাসক পদে নিয়োগ দিতেন এবং তাঁদের কর্মকাণ্ডে কড়া নজর রাখতেন। সৎ ও দায়িত্বশীলদের পুরস্কৃত করার পাশাপাশি দুর্নীতিতে ধরা পড়লে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দিতেন।
সেনাবাহিনীর আর্থিক নিরাপত্তাও তাঁর অগ্রাধিকারে ছিল। যুদ্ধে থাকাকালীন সেনাদের পরিবার-পরিজনের সার্বিক দায়িত্ব খলিফা নিজে তদারকি করতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করতেন।
আরও পড়ুন
ওয়াক্ফ সম্পর্কে ইসলাম কী বলে
১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ভোক্তা অধিকার রক্ষা
ব্যবসা-বাণিজ্যকে সততা ও আমানতদারির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে ওমর তিনি কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। মদিনার বাজারের শৃঙ্খলা ও লেনদেন শরিয়তসম্মত হচ্ছে কি না, তা দেখভালের জন্য সাইব ইবনে ইয়াজিদ ও আবদুল্লাহ ইবনে উতবা (রা.)–সহ একটি দলকে তিনি বাজার পরিদর্শক ও তদারককারী হিসেবে নিয়োগ দেন। (মইনুদ্দিন নদভি, আল-খিলাফাহ ওয়াল খুলাফাউর রাশিদুন, পৃষ্ঠা: ১০২-১০৫, মাকতাবা দারুল মুসান্নিফিন, আজমগড়, ১৯৫২)
তিনি নিজেও বাজার পর্যবেক্ষণে বের হতেন। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘পাগড়ি মাথায়, লাঠি বা চাবুক হাতে তিনি মদিনার বাজারে বাজারে হাঁটতেন এবং অপরাধী দেখলে শাস্তি দিতেন।’ (ইবনে সাআদ, তাবাকাতুল কুবরা, ৩/৩৩০, দারুস সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)
আকাশ থেকে সোনা-রুপার বৃষ্টি ঝরে না; বরং আল্লাহ মানুষের এক হাতের মাধ্যমে অন্য হাতকে রুজি দিয়ে থাকেন।
দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা.)
তিনি পণ্যের ন্যায্য দাম নির্ধারণের তাগাদা দিতেন। একবার এক ব্যবসায়ী জয়তুন (অলিভ) তেল কিনে এনে তা বিক্রি করতে গিয়ে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি দাম চেয়ে বসেন। ওমর (রা.) তাঁকে বললেন, ‘স্বাভাবিক দামে বিক্রি করো, নয়তো আমাদের বাজার থেকে বের হয়ে যাও। কারণ, আমরা এই দামে বিক্রি করতে দেব না।’ (ইবনু শাব্বাহ, তারিখুল মাদিনা আল-মুনাওয়ারাহ, ২/৩০৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৬)
ব্যবসায়ীদের যোগ্যতা ও শর্ত তাঁর আমলে যারা শরিয়তের বেচাকেনার নীতিমালা ও হালাল-হারামের পার্থক্য সম্পর্কে পুরোপুরি অভিজ্ঞ, শুধু তারাই বাজারে ব্যবসার অনুমতি পেত।
তিনি বাজারে টহল দিতেন আর ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য করে বলতেন, ‘সুদ কী, তা না জেনে কেউ যেন বাজারে ব্যবসা করতে না আসে। ইসলামি আইন সম্পর্কে যারা অজ্ঞ, তারা আমাদের বাজারে ব্যবসা করতে আসবে না; কারণ এতে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় সে সুদ খেয়ে বসবে।’ (শিবলি নোমানি, আল-ফারুক, ২/১৯৫, মাকতাবায়ে রহমানিয়া, লাহোর, ১৮৯৯)
আরও পড়ুন
ইসলামে প্রতিবন্ধীদের অপূর্ব অধিকার
০৯ জুন ২০২৬
মালিক ইবনে আওস বলেন, তিনি বাজারে স্বর্ণমুদ্রার বদলে রুপার মুদ্রা খুঁজছিলেন। তখন তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রা.) বললেন, ‘আপনার স্বর্ণমুদ্রা দিন, পরে এসে আমাদের খাদেমের কাছ থেকে রুপার মুদ্রা নিয়ে যাবেন।’
তাঁর কথা শুনে খলিফা তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ করে বললেন, ‘না, আল্লাহর কসম, আপনি তার রুপার মুদ্রা এখনই দিয়ে দিন, নয়তো তার স্বর্ণ ফেরত দিন।’ কারণ, নবীজি বলেছেন, ‘হাতে হাতে নগদ বদল না হলে স্বর্ণ-রুপা বা খাদ্যের এই বিনিময় সুদে পরিণত হয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৮৬)
ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম পণ্য মজুত করার প্রবণতা রোধেও তিনি সতর্ক ছিলেন। তিনি বলতেন, ‘আমাদের বাজারে কেউ যেন পণ্য মজুত করে না রাখে। যাদের হাতে অতিরিক্ত অর্থ আছে, তারা যেন বহিরাগত ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সব খাদ্যশস্য কিনে তা মজুত করে না রাখে। যে ব্যক্তি শীত-গ্রীষ্মের কষ্ট সহ্য করে আমাদের দেশে খাদ্যশস্য নিয়ে আসে, সে ওমরের মেহমান। অতএব সে তার আমদানি করা খাদ্যশস্য যে পরিমাণে ইচ্ছা বিক্রি করতে পারবে, আর যে পরিমাণে ইচ্ছা রেখে দিতে পারবে।’ (ইমাম মালিক, মুয়াত্তা মালিক, হাদিস: ২৪৩৯)
শ্রম ও উৎপাদনের তাগিদ
ওমর (রা.) জনগণকে অলসতা পরিহার করে পরিশ্রমের মাধ্যমে উপার্জন করতে উৎসাহিত করতেন। তিনি বলতেন, ‘হে দুস্থের দল, মাথা তোলো। ব্যবসা করো। পথ উন্মুক্ত, মানুষের ওপর বোঝা হয়ো না।’ (আবু ওবাইদ, কিতাবুল আমওয়াল, ১/৩৯৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৬)
তিনি আরও বলতেন, ‘আকাশ থেকে সোনা-রুপার বৃষ্টি ঝরে না; বরং আল্লাহ মানুষের এক হাতের মাধ্যমে অন্য হাতকে রুজি দিয়ে থাকেন।’ (ইমাম গাজালি, ইহয়াউ উলুমিদ্দিন, ২/৬২, দারুল মাআরিফ, বৈরুত, ১৯৯৮)
কোনো সুস্থ যুবককে বেকার বসে থাকতে দেখলে তিনি ক্ষুব্ধ হতেন এবং বলতেন, ‘সে আমার দৃষ্টি থেকে ঝরে গেছে।’ (ইবনুল জাওজি, মানাকিবু আমিরিল মুমিনিন উমার, পৃষ্ঠা: ১৮৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)
রিজিক অন্বেষণকে তিনি এতটাই গুরুত্ব দিতেন যে জিহাদের ময়দান ছাড়া জীবিকার প্রয়োজনে ভ্রমণরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করাকে অত্যন্ত সৌভাগ্যের মনে করতেন।
ইলিয়াস মশহুদ : লেখক ও গবেষক
আরও পড়ুন
শূন্য থেকে বিপুল সম্পদের মালিক
০৩ মে ২০২৬
প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
ইসলাম থেকে আরও পড়ুন
ইসলামের কথা
সাহাবিদের কথা
সাহাবি
হজরত উমর (রা.)
ইসলামের সৌন্দর্য
বাজেট ২০২৬-২৭
বাজার
অর্থনীতি



