বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ছে: অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঋণ ছাড় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭ বিলিয়ন ডলার
বিদেশি ঋণ বেড়ে ৭৭ বিলিয়ন ডলার, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে

বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ছে: অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঋণ ছাড় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭ বিলিয়ন ডলার

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিদেশি ঋণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আগের আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই বেপরোয়া প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় বাজেট সহায়তা এবং বড় উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থছাড় বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের সরকারি খাতে বৈদেশিক ঋণের দায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি। সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই অঙ্ক বিভিন্ন মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে চূড়ান্ত পর্যায়ে কিছুটা কমবেশি হতে পারে।

ঋণ বৃদ্ধির কারণ ও প্রকল্পের ভূমিকা

ইআরডির তথ্য অনুসারে, এই হিসাবে শুধুমাত্র অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্প ঋণ এবং বাজেট সহায়তা ঋণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারের গ্যারান্টি দেওয়া ঋণ এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নেওয়া ঋণ এতে ধরা হয়নি, যা বাস্তবে বৈদেশিক দায়ের পরিমাণ আরও বেশি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৬৮.৮২ বিলিয়ন ডলার, এবং পাঁচ বছরে এই দায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ঋণের পরিমাণ ছিল ৫০.৮৮ বিলিয়ন ডলার, যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

বড় প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হওয়া বা শেষ পর্যায়ে থাকা বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মেট্রোরেল এমআরটি-৬, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থছাড় তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।

বাজেট সহায়তা ও মুদ্রা বিনিময় হারের প্রভাব

গত অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্প ঋণের তুলনায় বাজেট সহায়তা ঋণ বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধিতে বেশি ভূমিকা রেখেছে। ঋণ পরিশোধের চাপ কমাতে সরকার বড় নতুন মেগা প্রকল্পে ঋণ না নেওয়ার কৌশল নিলেও, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সহায়তা দিতে রেকর্ড ৩.৪১ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা ঋণ গ্রহণ করেছে। এর আগে সর্বোচ্চ বাজেট সহায়তা ঋণ নেওয়া হয়েছিল ২০২১-২২ অর্থবছরে, যার পরিমাণ ছিল ২.৫৬ বিলিয়ন ডলার।

মুদ্রা বিনিময় হারের পরিবর্তনও ঋণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে জাপানি ইয়েনে নেওয়া ঋণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, কারণ এটি একটি অস্থির মুদ্রা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতি ডলারে ইয়েনের মূল্য ছিল ০.০০৬৩ ডলার, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.০০৬৯ ডলারে। এই বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে বৈদেশিক ঋণের দায় প্রায় এক বিলিয়ন ডলার বেড়েছে, এবং ভবিষ্যতে মুদ্রা বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে ঋণ পরিশোধের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সতর্কতা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

অন্তর্বর্তী সরকার উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও রক্ষণশীল নীতি অনুসরণ করেছে। বড় মেগা প্রকল্পে নতুন করে বেশি ঋণ নেওয়া হয়নি এবং পাইপলাইনে থাকা অনেক প্রকল্প পুনরায় পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং আইএমএফ থেকে রেকর্ড পরিমাণ বাজেট সহায়তা গ্রহণ করা হয়েছে, যা বৈদেশিক ঋণের দায় বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ প্রায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। তাই নতুন সরকারকে শুরু থেকেই ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সংযত ও বাস্তবসম্মত নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। কঠিন শর্তযুক্ত বা অনমনীয় ঋণ এড়িয়ে চলা এবং দ্রুত সুফল পাওয়া যায়—এমন প্রকল্পেই বৈদেশিক ঋণ নেওয়া উচিত। ইআরডির প্রাথমিক হিসাবে আরও দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে পাইপলাইনে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২.৬০ বিলিয়ন ডলারে, যার প্রায় পুরো অংশই ঋণ।

সব মিলিয়ে, বাজেট সহায়তা ও বড় প্রকল্পের অর্থছাড়ের কারণে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়লেও নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে ঋণ পরিশোধের চাপ ও বিনিময় হারজনিত ঝুঁকি। এখনই সতর্ক না হলে ভবিষ্যতে এই ঋণের বোঝা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে। স্বল্প রাজস্ব আদায় ও বৈদেশিক মুদ্রায় অপেক্ষাকৃত কম আয় এই সমস্যাকে আরও তীব্র করছে, এবং উভয় ক্ষেত্রে সক্ষমতা না বাড়ালে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।