সালেহউদ্দিন আহমেদের সাক্ষাৎকার: বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সময় লাগবে, ব্যাংক সংস্কার জরুরি
প্রাক্তন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ জাতীয় বেতন কাঠামোর সুপারিশ বাস্তবায়নে পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতির ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এক বাজেটে নয়, বরং দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। প্রথমে ছয় মাসের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তারপর আরও ছয় মাসের জন্য। এই পদ্ধতিতে চাপ কমবে বলে তিনি মনে করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ও বেতন কাঠামোর যৌক্তিকতা
সালেহউদ্দিন আহমেদের মতে, প্রায় এক যুগ ধরে নতুন বেতন কাঠামো না হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, ২০তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর মূল বেতন ৮ হাজার টাকার মতো, যা ভাবা কঠিন। ভারতে সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন ১৯ হাজার ভারতীয় রুপি, আর সর্বোচ্চ গ্রেডে ২ লাখ ৪৪ হাজার ভারতীয় রুপি। পাকিস্তানেও প্রতিবছর সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ছে। তাই বাংলাদেশে সরকারি কর্মচারীদের বেতন–ভাতা বৃদ্ধির শতভাগ যৌক্তিকতা আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে অভিজ্ঞতা ও নীতি প্রভাব
দেড় বছর অর্থ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকে সালেহউদ্দিন আহমেদ খুব এক্সাইটিং বলে বর্ণনা করেছেন। মানুষের জন্য সরাসরি কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে, এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে, তা কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, রোজার সময় খেজুরের দাম কমানোর জন্য শুল্ক–কর হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে সরকারি শিশুসদনের ছেলেদের কম দামে ভালোমানের খেজুর খাওয়ানো সম্ভব হয়েছিল।
চ্যালেঞ্জ ও আমলাতন্ত্রের পর্যবেক্ষণ
সালেহউদ্দিন আহমেদের বড় ধরনের খারাপ অভিজ্ঞতা ছিল বেতন কমিশনের প্রসঙ্গে। ভাতা দেওয়ার দাবিতে এক দিন তাকে সচিবালয়ে ঘেরাও করা হয়েছিল, যা তিনি আশা করেননি। তবে পরে অনেকে ক্ষমা চেয়েছেন। আমলাতন্ত্র নিয়ে তিনি বলেন, একটা বড় অংশ বুদ্ধিমান ও সৃজনশীল, কিন্তু দেশের ভেতরে নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে বেশি চিন্তা করেন। তিনি ফাইল দুই থেকে তিন মাস ফেলে রাখার প্রবণতার সমালোচনা করেন এবং এর উত্তরণ চান।
নির্বাচিত সরকারের জন্য পরামর্শ
সালেহউদ্দিন আহমেদের মতে, ব্যাংক খাতের সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। তিনি নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য উত্তরাধিকার নোট রেখে যাচ্ছেন, যাতে দায়িত্ব গ্রহণের পর কাজ এগিয়ে নিতে সুবিধা হয়। পরবর্তী সরকারের উচিত হবে নতুন কাজ শুরুর বদলে চলমান সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা। তিনি সচিব ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, দেশের স্বার্থে ও অর্থনীতির স্বার্থে যা দরকার, তা সাহস করে অর্থমন্ত্রীকে অবহিত করতে হবে।
ব্যাংক আইন ও পুঁজিবাজার
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের কাজটি এখনো হয়নি বলে সালেহউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এ দুটি কাজ অনেক চিন্তাভাবনা করে করতে হবে, এবং নির্বাচিত সরকার এই কাজ করবে। ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককেও জবাবদিহির আওতায় নেওয়ার বিষয় আছে বলে তিনি মনে করেন। পুঁজিবাজার উন্নয়নে মুদ্রাবাজারের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
অর্থনীতির ভবিষ্যৎ
সালেহউদ্দিন আহমেদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নির্বাচিত সরকার নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করবে এবং দরকারি আইনকানুনগুলো প্রণয়ন করবে। তিনি বিশ্বাস করেন, তারা অর্থনীতিকে একটা ভালো জায়গায় উত্তরণ ঘটাবে।
