নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুক্রবার সকালে অনুষ্ঠিত মহান মে দিবসের শ্রমিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সাধারণ সম্পাদক ও সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন। তিনি বলেন, বাজারদর ও মাথাপিছু আয় বিবেচনা করে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিক শোষণ, মজুরি চুরি-ছাঁটাই-নির্যাতন বন্ধ ও ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার বাধামুক্ত করতে হবে।
মে দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
রাজেকুজ্জামান রতন তাঁর বক্তব্যে মে দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে অগাস্ট স্পাইজ, এঞ্জেলস, ফিশার ও অন্য শ্রমিকনেতারা প্রাণ দিয়েছিলেন। আন্দোলনের অপরাধে তাদের ফাঁসি দেওয়া হয় এবং নির্যাতন করা হয়। মালিক ও সরকার ভেবেছিল নির্যাতনের মাধ্যমে শ্রমিক আন্দোলন চিরতরে দমন করা সম্ভব, কিন্তু তারা ভুল করেছিল। ন্যায্য দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে কখনো হত্যা আর নির্যাতনের মাধ্যমে দমন করা যায় না। বরং সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর দেশে দেশে। ১৮৮৯ সালে ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক প্যারিস কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রতিবছর ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস পালিত হবে।
ন্যায্য মজুরির দাবি
রাজেকুজ্জামান বলেন, আট ঘণ্টা কাজের দাবির মধ্যেই ন্যায্য মজুরির দাবি নিহিত। খাদ্য-পোশাক, ইমারত, ওষুধ-যানবাহনসহ যা কিছু মানুষ ব্যবহার করে, সবই তৈরি হয় শ্রমিকের শ্রমে। কাজের বিনিময়ে শ্রমিক পান মজুরি, মালিক নেন মুনাফা। শ্রমিকদের বেশি সময় ধরে কাজ করালে এবং কম মজুরি দিলে মালিকের মুনাফা বাড়ে। শ্রমিক চান এমন মজুরি, যাতে মানসম্মত জীবনযাপন, সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা, বাসাভাড়া ও বৃদ্ধ বয়সের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। কিন্তু বাস্তবে শ্রমিক মাস শেষে যে মজুরি পান, বাড়িভাড়া ও দোকানের বাকি পরিশোধ করতেই তাঁকে আবার দেনায় জড়িয়ে পড়তে হয়। সারা জীবন তাঁকে এই চক্রে আটকে থাকতে হয়। তাই আট ঘণ্টা কাজ ও ন্যায্য মজুরি এবং শোষণমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবি একসঙ্গেই উঠেছিল।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাসদের এ নেতা বলেন, বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ হাজার টাকার কম হলে তা ন্যায্য মজুরি হবে না। সরকার বলে মাথাপিছু আয় ২৮৪২ ডলার, সে অনুযায়ী ৫ সদস্যের পরিবারের মাসিক আয় হওয়া কথা ১ লাখ ৪৪ হাজার টাকার বেশি। বাস্তবে কোনো শ্রমিক পরিবারের এ পরিমাণ আয় হয় না। ক্ষমতাসীনেরা দেশের উন্নতির জন্য গর্ব করেন, কিন্তু শ্রমিকের মজুরি নিয়ে নীরব। পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা শ্রমিক আর ধনী মালিকের দেশ বাংলাদেশ। একই সঙ্গে আয়বৈষম্যের দেশও বাংলাদেশ। সব সেক্টরেই শ্রমিক মানসম্মত মজুরি থেকে বঞ্চিত। শ্রমিকের কম মজুরিই বৈষম্যের মূল কারণ।
রাজেকুজ্জামান রতন আরও বলেন, ‘সমাজতান্ত্রিক দেশে ছয় ঘণ্টা কর্মদিবস করা হয়েছিল, পুঁজিবাদী দেশে ওভারটাইম ছাড়া সংসার চলে না। যেখানে মে দিবসের সূচনা, সেই আমেরিকায় সরকারিভাবে মে দিবস পালিত হয় না। মৌলবাদী চিন্তা দিয়ে পরিচালিত দেশগুলোতেও না। মে দিবসের শিক্ষা—লড়াইয়ের পথেই মুক্তি। দাবি ন্যায্য হলেও লড়াই ছাড়া আদায় হয় না। মালিক বা পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের কাছে দয়া চেয়ে অধিকার আসে না। শোষণ উচ্ছেদ করেই কর্মঘণ্টা কমানো ও ন্যায্য মজুরি আদায় সম্ভব। মে দিবসের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হই, আওয়াজ তুলি।’
সমাবেশে অন্যান্য বক্তা
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি আবু নাঈম খান বিপ্লবের সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য দেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর অসিত বরণ বিশ্বাস, গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি সেলিম মাহমুদ, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার সহসভাপতি এম এ মিল্টন, রি-রোলিং স্টিল মিলস শ্রমিক ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি জামাল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক এস এম কাদির, গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ জেলার মটরযান মেকানিক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তাজুল ইসলাম প্রমুখ। সমাবেশ শেষে নগরের লাল পতাকা মিছিল করা হয়।



