সরকারি গ্যারান্টিতে ঋণ নিতে এখন মাশুল দিতে হবে
সরকারি গ্যারান্টিতে ঋণ নিতে এখন মাশুল দিতে হবে

রাষ্ট্রীয় সংস্থা, সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি বা যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান দেশি কিংবা বিদেশি উৎস থেকে সরকারের গ্যারান্টি তথা নিশ্চয়তায় নতুন ঋণ নিতে চাইলে এখন থেকে নির্দিষ্ট হারে মাশুল দিতে হবে। সরকার মোট নিশ্চয়তাযোগ্য ঋণের বিপরীতে এককালীন দশমিক ২৫ শতাংশ মাশুল নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ‘রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি/কাউন্টার গ্যারান্টি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা অনুসরণের মাধ্যমে আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে অর্থ মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর অনুমোদনের পর নতুন নীতিমালা জারি করা হবে।

মাশুল নির্ধারণের কারণ

অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতে, এত দিন বিনা মূল্যে এ সুবিধা দেওয়ায় সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আর্থিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। এতে অদক্ষ বিনিয়োগ ও ঋণের অপব্যবহার উৎসাহিত হয়। মন্ত্রণালয় বলছে, মাশুল নির্ধারণ বাধ্যতামূলক হলে সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো বুঝেশুনে ঋণ নেবে এবং ঋণের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় করবে। এতে সরকারের আর্থিক ঝুঁকি কমবে।

সংশোধিত নীতিমালার বিস্তারিত

সম্প্রতি অর্থসচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কমিটির (সিডিএমসি) বৈঠকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কৃষি, জ্বালানি ও বিমান খাতের অংশীজনেরা নীতিমালা সংশোধন ও মাশুল নির্ধারণের পক্ষে মত দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সংশোধিত নীতিমালায় আরও বলা হচ্ছে, ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান নিশ্চয়তাযুক্ত অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে এবং সরকারকে গ্যারান্টার হিসেবে অর্থ পরিশোধ করতে হলে সেই অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ থেকে কেটে নেওয়া যাবে। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়কে আইনি সুরক্ষা বা এখতিয়ার দেওয়ার কথাও থাকছে। নিশ্চয়তা দেওয়ার আগে ঋণগ্রহীতা সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি করবে অর্থ মন্ত্রণালয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রচ্ছন্ন দায় ও ঝুঁকি

অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ঋণের বিপরীতে নিশ্চয়তা দেওয়ার কারণে সরকারের প্রচ্ছন্ন দায়ের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৬ শতাংশ। জাতীয় বাজেটের জন্য এটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষে সরকারের প্রচ্ছন্ন দায় বেড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। প্রচ্ছন্ন দায় সরাসরি দায় নয়, তবে যেকোনো সময় তা প্রকৃত দায়ে পরিণত হতে পারে।

সরকার যেমন বাজেটের প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যয় মেটাতে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয়, তেমনি সরকারি মালিকানাধীন আর্থিক ও অআর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ঋণ নিতে হয়। এসব ঋণের কারণে সরকারের ওপর সম্ভাব্য যে দায় তৈরি হয়, সেটিই ‘প্রচ্ছন্ন দায়’। মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কৃষি ও বেসামরিক বিমান চলাচলসহ বিভিন্ন প্রবৃদ্ধি-সঞ্চারি খাতের ঋণের বিপরীতে সরকার গ্যারান্টি বা কাউন্টার গ্যারান্টি দিয়ে থাকে।

পাঁচ বছরের বাজেট বিশ্লেষণ

পাঁচ বছরের বাজেট সংক্ষিপ্তসার পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রচ্ছন্ন দায় নিয়ে কোথাও জোরালো কোনো বক্তব্য নেই। শুধু বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সময়মতো ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে তা পরিশোধের দায় সরকারের ওপর বর্তায় এবং সরকারের ভবিষ্যৎ আর্থিক অবস্থার ওপর এর প্রভাব রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার কথা বলতে রাজি হননি। তবে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এতে কর–বহির্ভূত আয় (এনটিআর) বাড়বে, ঋণ ব্যবস্থাপনায় আর্থিক শৃঙ্খলা আসবে এবং ঋণগ্রহীতা সংস্থাগুলোও জবাবদিহির মধ্যে থাকবে।’ তবে এতে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণের খরচ বাড়বে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সরকার কেন এবং কাদের নিশ্চয়তা দেয়

অনেক ক্ষেত্রে ঋণদাতা সংস্থা ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে পর্যাপ্তভাবে বিশ্বাস করতে না পারায় সরকারকেই গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা দিতে হয়। সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এ নিশ্চয়তা দেওয়ার এখতিয়ার রাখে। তবে নিশ্চয়তা দেওয়ার আগে সরকারি নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়।

বর্তমান প্রচ্ছন্ন দায়ের চিত্র

বর্তমানে প্রচ্ছন্ন দায়ের ৫০ শতাংশের বেশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের। এ ছাড়া কৃষি খাত এবং বাংলাদেশ বিমানের অনুকূলেও সরকারের বড় অঙ্কের নিশ্চয়তা রয়েছে। তেল আমদানির জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বিদেশি একটি সংস্থা থেকে ঋণ নিয়েছে, যার বিপরীতে সরকার নিশ্চয়তা দিয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি) ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) কৃষিঋণের বিপরীতেও সরকারি নিশ্চয়তা রয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ বিমানের জন্য কয়েক বছর ধরে বড় অঙ্কের নিশ্চয়তা দিয়ে আসছে সরকার। বিমানের জন্য সোনালী ব্যাংককে (ইউকে) ১ হাজার ৮৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। ডিসি-১০ কেনার অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ১৯৮৭ সালে সরকারকে বিমানের পক্ষে ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হয়েছিল।

জেলা পর্যায়ে ডিজিটাল টেলিফোন স্থাপন এবং বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানির জন্য দুটি প্রতিষ্ঠানকে ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ প্রকল্পের জন্য এইচএসবিসিকে দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকার নিশ্চয়তা। এ ছাড়া বাংলাদেশ পাটকল সংস্থা, চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ঋণের বিপরীতেও সরকার নিশ্চয়তা দিয়ে থাকে। এসব নিশ্চয়তা দেওয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংককে।

আন্তর্জাতিক চর্চা ও ভবিষ্যৎ

বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি নিশ্চয়তার বিপরীতে মাশুল নেওয়া আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক চর্চা। কারণ, নিশ্চয়তা মানেই শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের আর্থিক ঝুঁকি নেওয়া। বাংলাদেশে এত দিন এ সুবিধা বিনা মূল্যে দেওয়ায় প্রকৃত ঝুঁকির কোনো মূল্যায়ন হয়নি। নতুন নীতিমালা সেই সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে পারে।