সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চলেছে সরকার। আগামী ১ জুলাই থেকে দেশের সকল সরকারি রাজস্ব ও অন্যান্য প্রাপ্তি ১০০% অনলাইন 'এ-চালান' পদ্ধতির আওতায় আনা হচ্ছে। একইসাথে, বহু বছর ধরে চালু থাকা ম্যানুয়াল চালান পদ্ধতি সম্পূর্ণ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।
স্বচ্ছতা ও ঋণ নির্ভরতা কমবে
সরকার দাবি করছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে, নগদ অর্থের প্রকৃত অবস্থাリアল টাইমে জানা যাবে এবং অপ্রয়োজনীয় ঋণ নির্ভরতা হ্রাস পাবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিভিন্ন ব্যাংকে ছড়িয়ে থাকা সরকারি অর্থ কেন্দ্রীয় অ্যাকাউন্টে আসলে সরকারের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে।
পরিপত্রে নির্দেশনা
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের সরকারি ঋণ ও আর্থিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা উপ-বিভাগ থেকে জারি করা এক পরিপত্রে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিপত্রে বলা হয়েছে, সংবিধান ও ট্রেজারি বিধিমালা অনুযায়ী, সকল সরকারি রাজস্ব ও প্রাপ্তি বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে (টিএসএ) জমা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক বিভাগ এখনও পুরনো ম্যানুয়াল কোড ব্যবহার করছে এবং কিছু প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক ব্যাংকে আলাদা অ্যাকাউন্ট খুলে সরকারি টাকা জমা করছে।
অর্থ বিভাগের উদ্বেগ
অর্থ বিভাগ বলছে, বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরকারি অর্থ ছড়িয়ে পড়ায় সরকারের প্রকৃত নগদ ব্যালেন্স নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে একদিকে যেমন অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা কমছে, অন্যদিকে সরকারের হাতে থাকা অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে উন্নয়ন ব্যয় ও অন্যান্য খাতের চাহিদা মেটাতে সরকারকে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে উচ্চ সুদের ঋণ নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ অলস পড়ে রয়েছে।
টিএসএ পদ্ধতির সুবিধা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট (টিএসএ) মূলত সরকারের কেন্দ্রীয় নগদ ব্যবস্থাপনার একটি আধুনিক পদ্ধতি। এর মাধ্যমে সরকারের সকল আয়-ব্যয় একটি কেন্দ্রীয় কাঠামোর আওতায় আসে। এতে সরকারের কাছে কত নগদ অর্থ আছে, তা কোথায় জমা আছে এবং কোন খাতে কত ব্যয় হচ্ছে তাリアল টাইমে জানা সম্ভব।
ই-চালান পদ্ধতি
সরকার ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে সরকারি রাজস্ব অনলাইনে জমা দেওয়ার জন্য 'ই-চালান' ব্যবস্থা চালু করে। নাগরিকরা একটি ৫৬ অঙ্কের বিশেষ কোডের মাধ্যমে সরকারি ফি, কর, ভ্যাট, সেবা চার্জ ও অন্যান্য অর্থ অনলাইনে জমা দিতে পারেন। এই ব্যবস্থায় সরাসরি ব্যাংকে না গিয়ে বিভিন্ন ডিজিটাল চ্যানেলে অর্থ জমা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে অনেক সরকারি অফিস এখনও পুরোপুরি এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। কোনো কোনো জায়গায় পুরনো বিল বই ও ম্যানুয়াল কোড ব্যবহার করে অর্থ জমা নেওয়া হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ম্যানুয়াল পদ্ধতি সম্পূর্ণ বন্ধ করলে দুর্নীতি, দেরি ও হিসাব জটিলতা অনেক কমে আসবে। একইসাথে সরকারি অর্থ সংগ্রহের পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আসবে।
পরিপত্রে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত
- প্রথমত: আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ম্যানুয়াল বিল ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে সকল ধরনের সরকারি রাজস্ব ও প্রাপ্তি ১০০% 'ই-বিল' এর মাধ্যমে জমা দিতে হবে।
- দ্বিতীয়ত: কোনো মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর বা অধীনস্থ অফিসের নিজস্ব আলাদা রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থা বা সফটওয়্যার থাকলে তা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
- তৃতীয়ত: বাণিজ্যিক ব্যাংকে সরকারি বিভাগের নামে থাকা সকল অর্থ 'ই-চালান' এর মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক অর্থনৈতিক কোড ব্যবহার করে ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশ্লেষকদের মতে, এটি সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় একটি বড় সংস্কার পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি বিভাগ নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করায় অর্থ ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব ছিল। কোনো বিভাগের কাছে কত টাকা জমা আছে তা কেন্দ্রীয়ভাবে জানা সম্ভব হতো না। এখন সব অর্থ টিএসএ-তে স্থানান্তরিত হলে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক একই প্ল্যাটফর্মে সরকারি নগদ প্রবাহ মনিটর করতে পারবে। এতে ব্যয় পরিকল্পনা ও ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
তবে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জও কম নয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক সরকারি অফিস এখনও পুরোপুরি ডিজিটাল অবকাঠামোর আওতায় আসেনি। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে অভ্যস্ত। ফলে ১০০% ই-চালান বাস্তবায়নে প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও কঠোর তদারকির প্রয়োজন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ঋণের চাপ কমবে
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারের নগদ অর্থ একক অ্যাকাউন্টে চলে এলে নতুন ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন কিছুটা কমে আসবে। একদিকে সরকারের ব্যাংকে অলস অর্থ জমা থাকে, অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে ঋণ নিতে হয়—এই অসামঞ্জস্য দূর করতেই টিএসএ কেন্দ্রিক অর্থ ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হচ্ছে। এতে সরকারি ঋণের সুদ ব্যয় কমবে এবং সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।



