লিচু বেশি খেলে ক্ষতি: বৈজ্ঞানিক সত্য কী?
লিচু বেশি খেলে ক্ষতি: বৈজ্ঞানিক সত্য কী?

লিচু বেশি খেলে ক্ষতি—এই ভয়টা কি বৈজ্ঞানিক? সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, লিচুতে থাকা হাইপোগ্লাইসিন এ ও এমসিপিজি নামক রাসায়নিক যৌগ রক্তে শর্করা কমিয়ে দিতে পারে। তবে এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

ফলের ভেতরে যা লুকিয়ে

লিচু নিয়ে বিজ্ঞানীরা গুরুত্বসহকারে ভাবতে বসেন একটি রহস্যের সমাধান করতে গিয়ে। ভারতের বিহারের মুজাফফরপুরে প্রতি লিচুর মৌসুমে শিশুরা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ত। খিঁচুনি, জ্ঞান হারানো, এমনকি মৃত্যুও হতো। বছরের পর বছর এমনটি ঘটত। কিন্তু কারণ জানা যেত না।

২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি ও ভারতের স্বাস্থ্য দপ্তর মাঠে নামল। ২০১৭ সালে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ-এ এর ফলাফল বের হলো। লিচু খাওয়া এবং এই স্নায়বিক অসুস্থতার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র পাওয়া গেল। আক্রান্ত শিশুদের প্রস্রাবে মিলল দুটি রাসায়নিকের চিহ্ন—হাইপোগ্লাইসিন এ এবং এমসিপিজি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নাম দুটি একটু বুঝে নেওয়া দরকার। হাইপোগ্লাইসিন এ এবং মিথাইলিনসাইক্লোপ্রোপাইলগ্লাইসিন বা এমসিপিজি লিচুতে প্রাকৃতিকভাবেই থাকে। কাঁচা লিচুতে এদের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। পাকলে কমে আসে, তবে পুরোপুরি যায় না। ফলের শাঁসের চেয়ে বীজে এর ঘনত্ব বেশি।

শরীরে ঢুকে এরা একটি নির্দিষ্ট কাজ করে। যকৃতে ফ্যাটি অ্যাসিড ভাঙার যে এনজাইম—অ্যাসাইল-কোএ ডিহাইড্রোজিনেস—সেটিকে আটকে দেয়। স্বাভাবিক অবস্থায় রক্তে শর্করা কমলে শরীর চর্বি ভেঙে জ্বালানি বানায়। এই রাস্তা বন্ধ হলে গ্লুকোজের বিকল্প আর কিছু থাকে না। ফলে হঠাৎ রক্তে শর্করা তলানিতে নেমে যায়।

সেখান থেকেই মস্তিষ্কে সংকট শুরু হয়। মস্তিষ্ক প্রায় পুরোপুরি গ্লুকোজনির্ভর। সরবরাহ না পেলে এর কোষ ফুলতে শুরু করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলে সেরিব্রাল এডিমা। একই সঙ্গে রক্তে অ্যাসিডের মাত্রা বাড়ে, দেখা দেয় মেটাবলিক অ্যাসিডোসিস। মাথাব্যথা থেকে খিঁচুনি, সেখান থেকে অজ্ঞান—ধাপগুলো খুব দ্রুত ঘটে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সবাই মারা যাচ্ছে না কেন তাহলে

এইখানেই আসল কথা। বিহারের শিশুগুলোর ক্ষেত্রে তিনটি জিনিস একসঙ্গে ঘটেছিল—অপুষ্টি, খালি পেট এবং একগাদা কাঁচা লিচু। আগের রাতে না খেয়ে ঘুমিয়েছে, ভোরে উঠে বাগান থেকে কাঁচা লিচু পেড়ে খেয়েছে—এই একই দৃশ্যপট বারবার দেখা গিয়েছিল।

সুস্থ-পরিপুষ্ট প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ খাওয়ার পর পাকা লিচু খেলে শরীর সেটি সামলে নিতে পারে। কিন্তু দুই থেকে দশ বছরের শিশু, যাদের লিভারে গ্লাইকোজেনের মজুত এমনিতেই কম এবং পেট খালি—তারা যদি অনেকটা কাঁচা লিচু খেয়ে ফেলে, তবে সমীকরণ দ্রুত ভেঙে যায়।

গরম ফল বলে যা শুনেছেন

মা-দাদিরা লিচুকে ‘গরম ফল’ বলতেন। বেশি খেলে মাথা ধরবে, গলাব্যথা হবে, নাক দিয়ে রক্তও পড়তে পারে। এই ধারণা আয়ুর্বেদিক। আধুনিক শারীরবৃত্ত বা ফিজিওলজি এটি সরাসরি মানে না। তবে উপসর্গগুলো একেবারে উড়িয়ে দেওয়াও যায় না।

লিচুতে শর্করা বেশি। একবারে অনেকটা খেলে রক্তে শর্করা চড়ে যায়, তারপর দ্রুত নিচে নামে। মাথাব্যথা সেখান থেকেই শুরু হয়। কারও কারও ক্ষেত্রে হালকা অ্যালার্জিও হয়। গলা ধরা, ঠোঁটে চুলকানি—এগুলো সত্যি ঘটে। তবে তা গরম ফল বলে নয়, বরং অন্য বৈজ্ঞানিক কারণে।

শুধু বিহার নয়। বাংলাদেশেও দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগানে শিশুরা কাঁচা লিচু পেড়ে খায়। গরমের দুপুরে খালি পেট, হাতের কাছে গাছভর্তি লিচু। ঘটনার ছাঁচটা কিন্তু একই।

কতটা লিচু খাওয়া যাবে

নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা বিজ্ঞান দেয় না। তবে বিহারে যখন প্রচারণা চালানো হলো—‘শিশুরা রাতে না খেয়ে ঘুমাবে না, কাঁচা লিচু খাবে না’, তখন পরের মৌসুমেই মৃত্যুহার অনেক কমে এল। এই একটি তথ্যই যথেষ্ট। ‘কীভাবে খাচ্ছেন’ প্রশ্নটা ‘কতটা খাচ্ছেন’ তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভরা পেটে পরিমাণ মেপে পাকা লিচু খেলে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষতির কিছু নেই। তবে শিশুদের বেলায় একটু নজর রাখুন। লিচু খেলে শরীর খারাপ হয়, কথাটি পুরোপুরি মিথ বা গুজব নয়, আবার সর্বজনীন সত্যও নয়। এর বাস্তব রাসায়নিক কারণ আছে। কিন্তু সে জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতি তৈরি হতে হয়। ফলটি আসলে দোষী নয়, দোষী হলো পরিস্থিতি।

মায়েরা ‘হাইপোগ্লাইসিন এ’ নাম জানতেন না। তবে তাঁরা নিজেদের অভিজ্ঞতায় যা বুঝেছিলেন, বিজ্ঞান সেটা ভুল প্রমাণ করেনি। শুধু একটু দেরিতে বুঝেছে, এই যা!