স্মৃতির পাতায় টমেটো ভর্তা আর ছিটা রুটি
স্মৃতির পাতায় টমেটো ভর্তা আর ছিটা রুটি

টমেটো ভর্তা আর ছিটা রুটি—এই দুই খাবার শৈশবের স্মৃতিতে আজও অমলিন। জ্বরমুখে লুকিয়ে টমেটো ভর্তা খাওয়ার কথা মনে পড়লে এখনো হাসি পায়। আর দাদুর বাড়ির ছিটা রুটি আর বাচ্চা মুরগির পাতলা ঝোলের স্বাদ যেন জিভে লেগে থাকে।

জ্বরমুখে টমেটো ভর্তা

স্কুলে পড়ার সময় একবার প্রচণ্ড জ্বর হয়েছিল। তখন জ্বর হলে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে থাকতে হতো, গোসল করা যেত না, ভাতও খাওয়া নিষেধ ছিল। এখনকার দিনে জ্বর এলে রোগীকে স্নানঘরে নিয়ে ঝরনার নিচে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, ভাতের নিষেধাজ্ঞাও উঠে গেছে। জীবনে অনেক জ্বর হয়েছে, আর ভাত তো প্রতিদিনই খাই, কিন্তু সেদিনের কথা ভুলিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তিন-চার দিনের জ্বরে কাবু ছিলাম। এর মধ্যে শুধু পাউরুটি, স্যুপ, হরলিকস—এসব খেয়ে বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। দুপুরবেলা সবাই খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কেউ কেউ বাসার বাইরে কাজে বা ক্লাসে গিয়েছিল। আমার জ্বর তখন একটু কম। ভাতের জন্য মন আনচান করছিল। চুপি চুপি বিছানা থেকে উঠলাম। নিজের বাড়িতেই চোরের মতো পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে নামলাম। ঢাকার আসাদ গেটের নিউ কলোনির ছোট ডুপ্লেক্স বাসার রান্নাঘরটা নিচতলায় ছিল। গিয়ে দেখি, ভাতের হাঁড়িতে তখনো উষ্ণ ভাত। পাশেই বাটিতে ঢাকনা দেওয়া টমেটোর ভর্তা। আমি জানি এই ভর্তার রেসিপি। পাকা টমেটো টুকরা টুকরা করে লবণ দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হয়। তারপর কাঁচা মরিচকুচি, পেঁয়াজকুচি, সামান্য লবণ (আগে লবণ দেওয়া হয়েছে, তাই স্বাদ বুঝে) দিয়ে মেখে নিতে হয়। শেষে অল্প একটু শর্ষের তেল ছড়িয়ে আরেকবার মেখে নেওয়া হয়। ওরে স্বাদ! জ্বরমুখে আমার মনে হচ্ছিল, এই খাবার পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবার। চুপি চুপি এদিক-ওদিক তাকিয়ে কয়েক লোকমা খেয়ে ফেললাম। চিবিয়ে খাওয়ার সময় ছিল না, কেউ দেখে ফেললে কী হবে—তাই টপাটপ গিলেই ফেললাম। আহ্ শান্তি। ঝটপট বাসন-চামচ ধুয়ে, যেখানকার ঢাকনা সেখানে দিয়ে অপরাধের কোনো চিহ্ন না রেখে বিছানায় ফিরে এলাম। কেউ কিছু বুঝল না, কিন্তু সন্ধ্যার পর আবার থার্মোমিটারের পারদ উঠে গেল। জ্বরে কাবু আমি কম্বলের ভেতর থেকে শুনি, মা-খালারা বলাবলি করছেন, 'জ্বরটা তো নেমে গিয়েছিল, আবার কেন উঠল!' আমি মনে মনে নিজেকে বলি, লুকিয়ে টমেটোভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়ার ফল, আত্মগ্লানিতে মরে যাই। যদিও অনেক পরে জেনেছি, ভাত খাওয়ার সঙ্গে জ্বরের সম্পর্ক ছিল না, টমেটোভর্তাও নির্দোষ ছিল। জীবনে বহুবার টমেটোভর্তা খেয়েছি, কিন্তু আজও মনে আছে সেই নির্জন দুপুরের কথা, সাধারণ রন্ধনপ্রণালির অসাধারণ স্বাদের কথা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ছিটা রুটি আর মুরগির ঝোল

স্কুলজীবনে গরমের ছুটিতে বা ঈদের ছুটিতে দাদুর বাড়ি বেড়াতে গেলে সকালে এক বিশেষ নাশতা খেতাম। ছোট ছোট গোল আলু দিয়ে বাচ্চা মুরগির ঝোল, সঙ্গে গরম-গরম ছিটা রুটি। নরসিংদী অঞ্চলের জনপ্রিয় নাশতা এটি। ষাটোর্ধ্ব জীবনে কত ধরনের নাশতা খেয়েছি। বাড়িতে তৈরি প্রতিদিনের আলুভাজা, হাতের রুটি থেকে শুরু করে ছুটির দিনের বউ খুদ, শুঁটকিভর্তা, ল্যাটকা খিচুড়ি আর ডিমভাজা—এমনকি পাঁচ তারকা হোটেলের বুফে ব্রেকফাস্ট। কিন্তু ছিটা রুটি আর মুরগির পাতলা ঝোল স্মৃতির পাতায় তার গৌরব আসন ধরে রেখেছে।

এখনো মনে আছে, খেত থেকে তোলা ছোট ছোট লাল আলু সেদ্ধ করে ছাল ছাড়িয়ে রাখা হতো। পালা মুরগি থেকে একটি ছোট মুরগি কেটে ধুয়ে পরিষ্কার করে অল্প তেল-মসলা দিয়ে ঝোল করা হতো। যোগ হতো সেই লাল আলু। ঘুলঘুলিতে বাসা বাঁধা কবুতরের বাক-বাকুম শুনতে শুনতে ঘুম থেকে উঠেই দেখতাম, দাদুর নির্দেশে মুরগির ঝোল তৈরি হচ্ছে। কিন্তু ছিটা রুটির দেখা নেই। চালের গুঁড়া, মাটির চুলা, নারকেলের আইচার ডাবুর (এক ধরনের চামচ), কলাগাছের অংশ দিয়ে তৈরি ব্রাশ, কড়াই—সব সরঞ্জাম তৈরি। সবাই খেতে বসার পর গরম-গরম ছিটা রুটি তৈরি হতো। লবণ-পানি-চালের গুঁড়ার মিশ্রণ ডাবুর দিয়ে মিশিয়ে নেওয়া হতো। কড়াইতে কলাগাছের ব্রাশ দিয়ে নামমাত্র তেল মাখিয়ে হাত দিয়ে ছিটিয়ে চালের মিশ্রণ দেওয়া হতো। তারপর রুটির পিঠ উল্টিয়ে গরম-গরম পরিবেশন। রীতিমতো লাইভ কিচেন। রুটির চেহারা অনেকটা জালির মতো। টলটলা ঝোলে ডুবিয়ে যাঁরা এই রুটি খেয়েছেন, তাঁরাই জানেন এর অপূর্ব স্বাদ!

জীবনে কত খাবার খেয়েছি, খাচ্ছি। কিন্তু লিখতে গিয়ে জ্বরমুখে টমেটোভর্তা আর লাইভ কিচেনের ছিটা রুটি কেন জয়যুক্ত হলো, তার উত্তর মনোবিজ্ঞানীরাই দিতে পারবেন বোধ হয়!