অলংকরণ: মাসুক হেলাল
জীবনের মাঝখানে থামা
জীবনের ঠিক মাঝখানে এসে মানুষ থামে। যেভাবে নদী থামে না, কিন্তু তারও স্রোত একদিন হঠাৎ ঘুরে যায়—নতুন কোনো বাঁকে, পুরোনো পাথরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে তেমনি মানুষও একদিন টের পায়, সে আর সেই আগের মানুষ নেই। সে বুঝতে পারে, পাহাড় থেকে নামতে থাকা একটি ঝরনার মতো তার শৈশব-যৌবন একদিন মিলিয়ে গেছে সমতলে। এখন সে সমতলের জলশান্ত, গভীর, কিন্তু কোথাও একটা স্থবিরতা আছে। পশ্চিমের মানুষ, এই থামার নাম দিয়েছে-‘দ্য মিডলাইফ ক্রাইসিস’, মানে ‘মাঝবয়সের সংকট’ আর আমি বলি, মধ্যদিনের ধূসর ছায়া।
আমাদের জীবনে একটা সময় আসে, যেমন অশ্বত্থগাছের জীবনে আসে এক বিষণ্ন বিকেল। তখন তার পাতাগুলো আর আগের মতো সবুজ থাকে না; বাতাস এলেই তারা কেঁপে ওঠে, যেন বহুদিনের পুরোনো কোনো স্মৃতি তাদের ভেতরে শিরশির করে। নদীরও এমন সময় আসে—বর্ষার জল নেমে গেছে, চর জেগেছে, তবু কোথাও গভীরে একটা স্রোত নিঃশব্দে বয়ে চলে। মানুষের মাঝবয়স বোধহয় তেমনই এক ঋতু।
আজ এই লেখা লিখছি তাদের জন্য, যারা জীবনের সেই নদীতটে এসে দাঁড়িয়েছেন—যেখানে পেছনের বনভূমি ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসে, সামনে কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যায় পথ। যদিও তরুণেরা এই লেখা পড়ে হয়তো ভবিষ্যৎ হাওয়ার গন্ধ পাবেন; আর বৃদ্ধেরা হয়তো চিনে নেবেন সেই পুরোনো সন্ধ্যায় পাখির মধুর ডাক।
দেশে থাকতে ‘দ্য মিডলাইফ ক্রাইসিস’ কথাটা শুনিনি কোনো দিন। আমাদের দেশের মানুষ গাছের মতো বাঁচে—ঝড় এলে মাথা নোয়ায়, রোদ এলে শুকিয়ে যায়, আবার বর্ষায় কচি পাতা গজায়। তারা নিজেদের দুঃখের আলাদা নাম রাখে না। কিন্তু পশ্চিমের মানুষেরা রসিক—তারা প্রতিটি বেদনার জন্য এক একটি শব্দ বানিয়ে নিয়েছে।
প্রথম সাক্ষাৎ
১৯৯০ সালের গোড়ার দিকে, আমার বয়স তখন চল্লিশের কাছাকাছি। থাকি ইলিনয়ের আরবানা-শ্যাম্পেইনের কাছে। এক সন্ধ্যায়, শীতের নরম আলোয়, বন্ধু-প্রতিবেশীদের কথাবার্তার ভেতর, চায়ের ধোঁয়া আর কাচের গ্লাসের শব্দের মধ্যে, আমার এক অধ্যাপক বন্ধু হঠাৎ বলে উঠলেন-‘আই থিঙ্ক আই অ্যাম ইন মিডলাইফ ক্রাইসিস; ইদার আই নিড আ মোটরসাইকেল, অর শ্যাল হ্যাভ টু ম্যারি অ্যাগেইন।’ আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হলো, যেন কোনো শুকনা শালবনের ভেতর দিয়ে হঠাৎ এক পাগলা হাওয়া বয়ে গেল। বিয়ের কথাটা বুঝলাম। দীর্ঘ সংসারও তো এক নদী-প্রতিদিন একই তীর, একই জল, একই মুখ; একসময় সেখানে শেওলা জমে। কিন্তু মোটরসাইকেল? মানুষের মাঝবয়সের বিষণ্নতার সঙ্গে সেই লৌহঘোড়ার কী সম্পর্ক?
প্রশ্নটা আমার মাথায় তখন থেকে এক বুনো লতার মতো জড়িয়ে রইল। অনেক বছর কেটে গেছে। এখন টেনেসির ন্যাশভিলে থাকি। রাজধানী শহরের উপকণ্ঠে বেলভিউ-এ ‘ম্যাককে’ নামে এক প্রকাণ্ড পুরোনো বইয়ের নতুন দোকান খুলেছে। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সেখানে ঢুকেই মনে হলো মৃত মানুষের নিশ্বাস কাগজের পাতায় পাতায় জমে আছে। পুরোনো বইয়ের গন্ধ, ধুলা, বিবর্ণ মলাট—যেন শরতের শুকনা পাতার স্তূপ। দোকানের বাইরে প্রবেশপথের বাঁ-দিকে ‘ফ্রি বুকস’ বিনে হঠাৎ চোখে পড়ল Midlife Crisis নামে একটি বই। হাতে তুলে দেখলাম-উপন্যাস। মানুষের একাকিত্ব আছে, ব্যথা-বেদনার কথা আছে, শরতের বৃষ্টি আছে, তবু আমার প্রশ্নের উত্তর নেই। বিনে পুস্তক বিনে রেখে হতাশ বুকে বেরিয়ে এলাম। গাড়ি চালাতে চালাতে দেখলাম রাস্তার লাইটগুলো দূরের জোনাকির মতো জ্বলছে। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই যেন কোনো অদৃশ্য বনের দিকে ছুটে চলেছে, অথচ কেউ জানে না—সেই বন কোথায় গিয়ে শেষ হবে।
বাসায় ফিরে শেফিল্ডে থাকা বন্ধু মাহবুবকে ফোন করলাম। এ বিষয়ে সে অনেক কিছু জানে; তবু মোটরবাইকের সঙ্গে মাঝবয়সের এই গোপন সম্পর্ক সে-ও ধরতে পারল না। শেষে গুগলের বিস্তীর্ণ অরণ্যে ঢুকে বহুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে উইকিপিডিয়ার পাতায় যেন এক টুকরা শালিকের ডাক শুনলাম। বুঝলাম-মোটরসাইকেল আসলে যন্ত্র নয়; মানুষের হারিয়ে যাওয়া যৌবনের দমকা বাতাস।
সংকটের ইতিহাস ও নারী-পুরুষের অভিজ্ঞতা
আমেরিকার বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী Elliott Jaques, ১৯৬৫ সালে প্রথম এই সংকটের নাম দিয়েছিলেন। কিন্তু তার আগে কি মানুষের জীবনে এই বিষণ্নতা ছিল না? নিশ্চয়ই ছিল। যেমন বনভূমিতে কুয়াশা ছিল, নদীতে জোয়ার ছিল, পাহাড়ে নীরবতা ছিল-নাম ছাড়াই। মাঝবয়সে এসে মানুষ হঠাৎ পেছনে তাকায়। তখন সে দেখে-যে জীবনকে সে একসময় মহাসমুদ্র ভেবেছিল, তা আসলে অনেকখানি শুকিয়ে যাওয়া নদী। চাওয়া আর পাওয়ার হিসাব মেলাতে গিয়ে তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শীত নেমে আসে।
নারীদের জীবনেও এই সংকট অন্য রকম আলো-ছায়া নিয়ে আসে। সন্তানরা দূরে চলে যায়-যেমন শরৎ এলে বকেরা উড়ে যায় দূরের বিলের দিকে। শরীর বদলে যায়; ঘরের ভেতর নিঃশব্দতা জমে। তাদের সংকট অনেক সময় ঘর, সন্তান, ভালোবাসা আর হারিয়ে যাওয়া প্রয়োজনীয়তার অনুভূতিকে ঘিরে।
পুরুষের সংকট
পুরুষের বেলায় সংকটটা যেন পাহাড়ি নদীর মতো-বাইরে শান্ত, অন্তরে পাথরে ধাক্কা খাওয়া স্রোত। সে হঠাৎ বুঝতে পারে, তার জীবনে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার পাহাড়ই বড়। শরীর ক্লান্ত হয়ে আসে। চোখের কোণে সন্ধ্যার ছায়া জমে। তখন সে নতুন কিছু চায়। কেউ চাকরি বদলায়। কেউ টাকাপয়সা উড়ায়। কেউ নতুন প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। কেউ হঠাৎ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আর কেউ মোটরবাইক কেনে। কারণ মোটরবাইকের ভেতরে আছে নদীর জোয়ার-ভাটা। সেখানে মানুষ আবার তরুণ হতে পারে; আবার রাস্তার উপর দিয়ে ছুটে যেতে পারে তীব্র গতিতে; আবার মনে করতে পারে জীবন এখনো শেষ হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা এই সংকটের বহু লক্ষণ বলেছেন। অকারণ বিষণ্নতা, অজানা স্বপ্নের পেছনে ছোটা, নিজের জীবন নিয়ে অসন্তোষ, একা থাকতে চাওয়া, পুরোনো ভালোবাসাকে প্রশ্ন করা, নতুন রোমাঞ্চের আকাঙ্ক্ষা, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হারানো মুখ খোঁজা—এসবই সেই সংকটের শুকনা ঝরাপাতা।
পরিণতিতে কেউ নেশা করে মদের ভেতর ডুবে থাকে—যেমন বর্ষার নদী কালো জলে ভরে ওঠে। কেউ পুরোনো ভুলের জন্য নিজেকে দগ্ধ করে। কেউ ছেলেমেয়েদের সাফল্যে নিজের অপূর্ণতা ঢাকে। কেউ দামি পোশাক পরে সময়কে ধোঁকা দিতে চায়। আর কেউ দ্বিতীয় বিয়ে করে—হায় হায় করে। পশ্চিমের দেশে মানুষ এর প্রতিকার খোঁজে শরীরচর্চায়, থেরাপিতে, ভ্রমণে। বাংলাদেশে মানুষ এখনো সন্ধ্যায় মসজিদের আজান শোনে। ভোরে নামাজ পড়ে। শিউলি ফুলের গন্ধ নেয়। হয়তো এই কারণেই এখানে সংকটের আগুন কিছুটা ধীর জ্বলে-কাঁচা কাঁঠালপাতার মতো। আমার মনে হয়, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় আশ্রয় হলো এই বোধ-আমরা সম্পূর্ণ একা নই। নদী যেমন শেষ পর্যন্ত সাগরে গিয়ে মিশে, মানুষও তেমনি এক বৃহত্তর অজানা রহস্যের ভেতর বেঁচে থাকে।
উপদেশ ও নিজের কথা
তবু যারা এই মাঝবয়সের কুয়াশার ভেতর দিয়ে হাঁটছেন, তাদের একটা কথা বলি। যদি খুব ইচ্ছা করে, একটা মোটরবাইক কিনে নিন। ভোরের রাস্তায় বেরিয়ে পড়ুন। পাহাড়ের পাশে দাঁড়ান। শালবনের গহিনে পথে বাতাসের শব্দ শুনুন। নদীর ধারে বসে সন্ধ্যা নামতে দেখুন। কিন্তু সাবধান-দ্বিতীয় বিয়ের দিকে হাঁটবেন না। কারণ, মোটরবাইক মানুষকে কিছুদিনের জন্য বাতাসের মতো হালকা করে; কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ে অনেক সময় জীবনের ওপর আরও এক স্তর ঘন কুয়াশা নামিয়ে দেয়।
আর শেষে নিজের কথা বলি। আমার বয়স এখন তিপ্পান্ন। গাড়ি আছে, সংসার আছে, দিনের কাজ আছে। তবু উইকেন্ড এলে কোথা থেকে যেন এক ঝোড়ো বাতাস এসে বুকের ভেতর ধাক্কা দেয়। মনে হয়-দূরের কোনো পাহাড়ি রাস্তা ডাকছে আমাকে; কোনো নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে এক কালো মোটরবাইক। তখন বুঝি-মানুষের ভেতরের তরুণ মনটি কখনো পুরোপুরি মরে না। সে শুধু বনভূমির পেটের ভেতর লুকিয়ে থাকে—ঠিক সন্ধ্যার আগে কোনো এক অচেনা পাখির মতো, সুখের খেলা খেলে বাড়ির সামনের শিমুলগাছের ডালে ডালে।
*লেখক: আবু এন এম ওয়াহিদ; অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি, এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ



