বইয়ের পাতায় বাঁধা এক জীবন: আমজাদুল হোসেনের পাঠক পরিচয়
ঢাকার বাসাবো এলাকায় একটি ছোট্ট গোছানো বাড়ি। ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে বই আর বই। ছাদ থেকে নিচ পর্যন্ত সাজানো একটি শেলফে সাদা মলাটে মোড়ানো শত শত বই। উল্টো দিকে একটি টেবিল, চেয়ার আর এক পাশে জানালা। এই ঘরটিই ৭৬ বছর বয়সী আমজাদুল হোসেনের ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার। বইগুলো পড়েন তিনি একাই। তাঁর কথায়, জীবনের একমাত্র পরিচয় তিনি পাঠক। অক্ষরজ্ঞান হওয়ার পর থেকেই বইয়ের সঙ্গে গড়ে উঠেছে অটুট বন্ধন।
শৈশব থেকে বইয়ের প্রতি অনুরাগ
আমজাদুল হোসেনের বই পড়ার শুরু বাবার হাত ধরে। সাতক্ষীরার সবুজ–শ্যামল পরিবেশে বাবার বাড়ির গ্রন্থাগার থেকেই প্রথম হাতে তুলে নিয়েছিলেন রবীন্দ্র রচনাবলী ও শরৎ রচনাবলী। বলাকা কাব্যগ্রন্থটি এখনো তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। প্রাইমারি স্কুল থেকেই নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। কবিতা, গল্প, ছোটগল্প, বিজ্ঞান, ধর্ম, দর্শনের বইকে সঙ্গী করে বেড়ে উঠেছেন তিনি।
খুলনার দৌলতপুর কলেজে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষ করলেও তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল দর্শন। পড়াশোনা শেষ করার আগেই শুরু হয় কর্মজীবন। ১৯৭৬ সালে সোনালী ব্যাংকে চাকরি শুরু করেন। তবে কর্মজীবন নিয়ে উচ্চাশা ছিল না তাঁর। তিনি চাইতেন শুধু বই পড়তে। জীবিকার প্রয়োজনে চাকরি করতেন, কিন্তু বই পড়ার নেশায় ছুটিতে আসতেন ঢাকায়।
ব্যাংকার থেকে পাঠক: জীবনযাত্রার নির্যাস
নারায়ণগঞ্জে পোস্টিং থাকাকালীন ব্যাংকের কাজ শেষেই ছুটে যেতেন জেলা গণগ্রন্থাগারে। কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতি হলে বই পড়ার সময় কমে যেতে পারে—এই ভয়ে উন্নতির পেছনে ছোটেননি কখনোই। বরং পদোন্নতি দেরিতে হলে খুশি হতেন। কর্মজীবনের সূত্রে রাজধানীতে থিতু হন। স্ত্রী নুরুননাহার, এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক তিনি। ছেলে–মেয়ে প্রতিষ্ঠিত এবং তাঁরাও বই পড়েন।
বড় মেয়ে অনুপম আসিফা তৃণা সরকারি চাকরিজীবী। তিনি বলেন, ‘আব্বুকে যখনই দেখি বই পড়েন। বাংলা, ইতিহাস, দর্শন, ইংরেজি, বিজ্ঞান যে বিষয়েই যখন কিছু জানতে চেয়েছি, ভালো উত্তর পেয়েছি। অনেক সময় শিক্ষকদের কাছেও সেসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর পাইনি।’ অনুপম আসিফার মতে, বাবাই তাঁদের বড় শিক্ষক।
গ্রন্থাগার ও পাঠের বিস্তৃতি
বাসাবোর বাড়িটিতে আমজাদুল হোসেনের গ্রন্থাগারে বইয়ের সংখ্যা দেড় হাজারের কাছাকাছি। তিনি নিজেই বইগুলোর ক্যাটালগ করেন। তাঁর পাঠের সীমা ব্যাপক:
- কাজী নজরুল ইসলাম, মাইকেল মধুসূদন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্য
- বায়েজিদ বোস্তামী, রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের আধ্যাত্মিক রচনা
- লিও তলস্তয়, প্লেটো, সৈয়দ মুজতবা আলীর দর্শন ও সাহিত্য
- বিজ্ঞান, হিন্দু দর্শন ও সুফিবাদের বই
জীবনের এই প্রান্তে এসে তিনি বেশি পছন্দ করেন দর্শন ও বিজ্ঞানের বই। সুফিবাদও তাঁকে বিশেষভাবে টানে। আমজাদুল হোসেন বলেন, ‘জীবনের প্রথম কাজ সৃষ্টি ও জীবনের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা। আমার জীবনবোধ, দর্শনকে নিয়েই প্রতিনিয়ত চলতে হবে। প্রতি ক্ষণে, নব নব রূপে অনুভব করা সেই দর্শনই জীবনের চালিকা শক্তি।’
দৈনন্দিন রুটিন ও উত্তরাধিকার
সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই প্রিয় গ্রন্থাগারে বসে বই পড়া শুরু হয়। পশ্চিমের জানালায় আলো নিভে আসা পর্যন্ত সেখানেই সময় কাটে। বইয়ের সাগরে তিনি অরূপরতন খোঁজেন। অমূল্য বইগুলো তিনি রেখে যেতে চান উত্তর প্রজন্মের জন্য। জীবনে পাওয়া না–পাওয়ার হিসাব তিনি কখনোই মেলাতে বসেননি। হিসাবের খাতা ব্যাংকেই ফেলে এসেছেন। তাঁর শুধু বই পড়াতেই আনন্দ।
স্ত্রী নুরুননাহার হেসে বলেন, আশপাশের অনেকেই জানতে চান স্বামীর সঙ্গে তাঁর কথা হয় কি না। কারণ, সবাই বেশির ভাগ সময় দেখতেন, তিনি নীরবে বই পড়ছেন। আমজাদুল হোসেনের জীবন প্রমাণ করে, বই পড়া কেবল একটি শখ নয়, এটি একটি জীবনদর্শন।



