প্রথমা বিক্রয়কেন্দ্রের পোড়া বইয়ের স্তূপে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ও জীবনের গল্প
প্রথমা বিক্রয়কেন্দ্রের পোড়া বইয়ের স্তূপে হারানো স্মৃতি

প্রথমা বিক্রয়কেন্দ্রের পোড়া বইয়ের স্তূপে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি ও জীবনের গল্প

পুড়ে যাওয়ার পর প্রথম আলোর পোড়া ভবনে আবার ঢোকার সুযোগ পেলাম গত ২ ফেব্রুয়ারি। ভেতরে ঢুকেই নাকে এল পোড়া কাগজের তীব্র গন্ধ, যা মনে করিয়ে দিচ্ছিল সেই ভয়াবহ রাতের কথা। নিচতলায় ঢুকলেই ডান পাশে প্রথমা বিক্রয়কেন্দ্র, যেটি আমি নিজে সামলাতাম বছরের পর বছর ধরে। চারদিকে শত শত বই ছাই হয়ে পড়ে আছে, এক পাশে তাক থেকে পড়ে আছে আধপোড়া আর পানিতে ভেজা বইয়ের স্তূপ।

বইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জীবনের স্মৃতি

যে সাতকাহন বসে বসে পড়ছিলাম, সেটি ঝলসে গেছে সম্পূর্ণভাবে। একাত্তরের চিঠিও আগুনে দগ্ধ হয়ে গেছে। একজন কমলালেবু পড়ে জীবনানন্দকে নতুন করে চিনেছিলাম, সেই বইটির একটি কপিও পানিতে ভিজে নষ্ট হয়ে আছে। পোড়া বইগুলো দেখে ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছিল, কারণ এসব বইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার সমগ্র জীবন। ২০০৫ সালে এসএসসি পাস করে ঢাকায় আসি এবং বাংলাবাজারের একটি বইয়ের দোকানে কাজ নিই। কাজের ফাঁকেই পড়াশোনা চালিয়ে যাই, এইচএসসি, তারপর স্নাতক—বইয়ের দোকানে কাজ করতে করতেই সব শেষ করেছি। কিন্তু পড়াশোনার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছিল বইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক, দিন দিন গভীর হয়েছে সে সখ্য।

আগুনের আঁচে কালচে হয়ে গেছে বইয়ের পাতা, যা একসময় জ্বলজ্বল করত জ্ঞানের আলোয়। ২০১৩ সালে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেখে প্রথমায় যোগ দিই, শুরুতে শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের বিক্রয়কেন্দ্রে দায়িত্ব পড়ে। ২০১৬ সালে আসি কারওয়ান বাজারে, প্রথম আলোর কার্যালয়ের নিচতলার এই বিক্রয়কেন্দ্রে। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত এটাই ছিল আমার প্রতিদিনের কর্মস্থল, সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা—এই ভবনেই কেটেছে অমূল্য সময়।

হামলার রাতের করুণ স্মৃতি

১৮ ডিসেম্বর রাতেও নিয়মিত কাজ শেষ করে বাসায় ফিরেছি, কিন্তু হঠাৎ রাত পৌনে ১২টার দিকে এক সহকর্মীর ফোনে খবর পাই, ‘অফিসে হামলা হয়েছে।’ তাড়াতাড়ি মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি, প্রথম আলো ভবনে আক্রমণ হয়েছে এবং নিজের হাতে সাজানো বইগুলো টেনে টেনে বের করে আগুন দেওয়া হচ্ছে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল, বাসায় নিজেকে আটকে রাখতে পারছিলাম না। অফিসে যোগাযোগ করলে বলা হলো, এ সময় না আসাই ভালো, ফলে রাতটা নির্ঘুম কেটেছে। মনে হচ্ছিল, বইয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেতরটাও পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।

সকাল হতেই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি এবং সাড়ে ছয়টার দিকে পৌঁছে যাই কারওয়ান বাজারে। তখনো ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভানোর কাজ করছেন, পানিতে ভেসে আসছে পোড়া ছাই। আমার কিছু ব্যক্তিগত জিনিস ডেস্কে রাখা ছিল, একবার ভেতরে ঢোকার সুযোগ পেলে দেখতাম—সেগুলো আছে, নাকি আগুনে পুড়ে গেছে। দিনভর সেই অপেক্ষা চলতে থাকে, মনটা ভারী হয়ে ওঠে স্মৃতির বোঝায়।

নতুন আশা ও পাঠকের ভালোবাসা

প্রথমার কারওয়ান বাজার বিক্রয়কেন্দ্র তো পুড়ে ছাই, তাই আবার আজিজ সুপার মার্কেট বিক্রয়কেন্দ্রে ডিউটি পড়ে। কিন্তু মনটা কিন্তু কারওয়ান বাজারেই পড়ে থাকে, কারণ এখানে জড়িয়ে আছে কত স্মৃতি, কত পাঠকের মুখ, কত বইয়ের সঙ্গেই না পরিচিত হয়েছি। অনেক পাঠক ফোন করে খোঁজ নিয়েছেন, তাঁদের ভালোবাসা আমাকে শক্তি দিয়েছে এই কঠিন সময়ে। বই পুড়িয়েছে, ভবন পুড়িয়েছে, কিন্তু বইয়ের প্রতি মানুষের এই যে ভালোবাসা, তা তো পোড়াতে পারেনি কোনোভাবেই।

কবে আবার বইয়ে বইয়ে সেজে উঠবে পোড়া ভবনের নিচতলা, সেই অপেক্ষাতেই এখন আছি। হাজার হাজার বইয়ের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ভালো যে দু–একটি পেলাম, নিজ হাতে সরিয়ে নিলাম সেগুলো, কারণ এগুলো শুধু কাগজ নয়, এগুলো জীবনের অংশ। এই গল্প শুধু একটি বিক্রয়কেন্দ্রের নয়, এটি বইপ্রেম ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার প্রতি এক মর্মান্তিক আঘাতের প্রতিচ্ছবি।