শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের বিচ্ছেদের ২৫ বছর পর হৃদ্যতাপূর্ণ মিলন
প্রায় পঁচিশ বছর ধরে বিচ্ছিন্ন থাকার পর বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ একটি অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকারে মিলিত হয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কে দূরত্ব থাকলেও কবিতার জগতে তারা কখনোই বিচ্ছিন্ন ছিলেন না বলে উভয়েই জানিয়েছেন। আল মাহমুদ স্পষ্ট করে বলেন, "ব্যক্তিগতভাবে আমরা বিচ্ছিন্ন থাকলেও আমাদের চর্চার ক্ষেত্র কবিতায় আমরা বিচ্ছিন্ন ছিলাম না। শামসুর রাহমান কবিতা লিখলে আমি পড়েছি। তাঁর স্টাইল লক্ষ করেছি।"
রাজনৈতিক বিভাজন ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম
দীর্ঘ বিচ্ছেদের কারণ সম্পর্কে আল মাহমুদ বলেন, "সেটা অবশ্য শামসুর রাহমান ভালো বলতে পারবেন।" তবে তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে যোগ করেন, "আমি তো শামসুর রাহমান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাইনি। কীভাবেই–বা হব, আমি তাঁর সমসাময়িক কালের কবি, একসঙ্গে কাজ করছি।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তাকে প্রায়ই মৌলবাদী আখ্যা দেওয়া হয়েছে, যা তার জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ ছিল।
শামসুর রাহমানও আল মাহমুদের কবিতার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "আল মাহমুদকে সব সময় ভালো কবি মনে করি। সব সময় আমি বলি, আল মাহমুদ যা-ই করুক না করুক, সে কবি হিসেবে খুবই উল্লেখযোগ্য এবং প্রথম শ্রেণির কবি।"
কবিতার পারস্পরিক পাঠ ও প্রভাব
দুই কবিই একে অপরের কবিতা নিয়মিত পড়েন বলে জানান। আল মাহমুদ বলেন, "শামসুর রাহমান একটা কবিতা লেখলে তরুণেরা কী বলে আমি থোড়াই কেয়ার করি। কিন্তু আমি তো পাঠ করি। কারণ, শামসুর রাহমান আমার সহবর্তী, অগ্রবর্তী কবি।" শামসুর রাহমানও এর প্রতিউত্তরে বলেন, "অবশ্যই আমি আল মাহমুদের সব কবিতা পড়ি।"
তাদের মধ্যে কবিতার স্টাইলগত পার্থক্য থাকলেও মৌলিক বিষয়ে তারা একমত। আল মাহমুদ বলেন, "ধর্মীয় কারণ তো কিছু আছেই। ধর্মকে কি কবিতার স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেছি? না, আমি মানুষের পক্ষে ছিলাম। এখনো মানুষের পক্ষেই আছি।"
বাংলা সাহিত্যের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
সাক্ষাৎকারে বাংলা সাহিত্যের বর্তমান অবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়। শামসুর রাহমান বলেন, "আমাদের ভাষাই প্রকৃত আধুনিক বাংলা ভাষা। ঢাকার সাহিত্য হচ্ছে যে ভাষায়, নাটক হচ্ছে যে ভাষায়, কবিতা হচ্ছে যে ভাষায়, এটাই হলো আধুনিক ভাষা।" আল মাহমুদও একমত পোষণ করে বলেন, "পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষা এখন কোথায়? এটা খোঁজ করে দেখতে হবে।"
পাঠকদের প্রশ্নে শামসুর রাহমান জানান, তার পাঠক মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির এবং সব বয়সের মানুষ। আল মাহমুদ বলেন, "আমার মনে হয় আমার পাঠক প্রকৃতপক্ষে তরুণেরাই। তরুণ-তরুণীরাই আমার বই কেনে বেশি আমি দেখেছি।"
নারী ও কবিতার সম্পর্ক
দুই কবিই নারীকে কবিতার কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন। শামসুর রাহমান বলেন, "নারী না থাকলে তো জীবনই মরুভূমি।" আল মাহমুদও বলেন, "নারীর কাছে দাবি করি, নারীর কাছে পাই এবং নারীর কাছে পরিতৃপ্ত হই। নারীর কাছে ফিরে যাই।"
সাক্ষাৎকারের শেষে দুই কবি আশা প্রকাশ করেন যে তাদের এই যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে। আল মাহমুদ বলেন, "এখন যদি শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়, এটা মনে হয় আজকে থেকে হচ্ছে।" শামসুর রাহমানও বলেন, "আজকেই যে প্রথম হয়েছে তা না।"
এই সাক্ষাৎকার বাংলা সাহিত্যের দুই প্রবাদপ্রতিম কবির মধ্যে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যা পাঠক ও গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে।
