পরিচিতার মৃত্যুর পর রহস্যময় ডায়েরি ও কবরস্থানের অদ্ভুত সাক্ষাৎ
পরিচিতার মৃত্যুর পর রহস্যময় ডায়েরি ও কবরস্থানের সাক্ষাৎ

পরিচিতার মৃত্যুর পর রহস্যময় ডায়েরি ও কবরস্থানের অদ্ভুত সাক্ষাৎ

দিনটি ছিল ১৫ নভেম্বর। সায়েম তখন স্টেট কলেজের সামনের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে। হাতে এক কাপ চা, চোখে অপেক্ষা। পরিচিতা আসবে। প্রতি সন্ধ্যার মতো আজও আসবে। ইন্টারমিডিয়েটে পড়ুয়া এই মেয়ের জন্য অপেক্ষা করাটাই তার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার ফাঁকে একমাত্র অবকাশ।

ঘড়িতে তখন সাড়ে পাঁচটা। ঠিক সেই মুহূর্তে দূর থেকে ভেসে এল এক বিকট শব্দ। ব্রেকের কর্কশ চিৎকার, তারপর লোহার সঙ্গে লোহার প্রচণ্ড সংঘর্ষ। সায়েম ছুটে গেল। পৌঁছানোর আগেই দেখতে পেল, জনতার ভিড় জমে গেছে ফার্মগেট মোড়ে। একটা বাস আর সিএনজির মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ। আর তার ভেতর থেকে যাকে বের করে আনছে, সে পরিচিতা। সাদা ওড়না লাল হয়ে গেছে। চোখ দুটো বন্ধ।

সায়েম হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল রাস্তার মাঝখানে। মাথা ঘুরছে। কী হচ্ছে? পরিচিতা কি তবে সত্যিই ভূত? না অন্য কিছু? আর এই রহস্য কী?

সাত দিন পর পরিচিতার বাসায় যাওয়া

সাত দিন কেটে গেছে। জানাজা শেষ। দাফন শেষ। সায়েম একা। পরিচিতাকে যে ভালোবাসত, তা কখনো ওকে বলা হয়নি। শুধু চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকা, পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় একবার চোখাচোখি হওয়া।

এই সাত দিনে একবারও পরিচিতার বাসায় যায়নি। সাহস পায়নি। কিন্তু আজ যাবে বলে ঠিক করল। ওর কিছু জিনিস নিতে চায়, যা পরিচিতা স্পর্শ করেছিল।

পরিচিতার মা দরজা খুলে দিলেন। চোখ ফুলে আছে, মুখ শুকনা। ভেতরে গিয়ে দেখে, ওর জিনিসপত্র গোছানো হচ্ছে। পরিচিতার বাবা জানালেন, ওর প্রিয় জিনিসগুলো ওর সঙ্গে দিয়ে দেবে। কবরের পাশে পুড়িয়ে দেবে।

সায়েম জিজ্ঞেস করল, কী কী জিনিস? পরিচিতার মা বললেন, ওর ডায়েরি, কিছু বই... ওই সব। সায়েম বলল, আমি কি একবার দেখতে পারি?

রহস্যময় ডায়েরির আবিষ্কার

একটা পুরোনো কাঠের বাক্স। তার ভেতর সাজানো পরিচিতার জিনিস। সবচেয়ে ওপরে একটা ডায়েরি। নীল রঙের কভার, কোনায় একটু ছেঁড়া। ডায়েরিটা হাতে নিতেই সায়েমের হাত কাঁপছে। খুলতে গিয়ে থমকে গেল। প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা, ‘সায়েম, যদি তুই এই ডায়েরি খুলে দেখিস, তাহলে বুঝবি, আমি আর নেই। কিন্তু তুই জানিস, আমি সব সময় তোর কাছেই আছি।’

রক্ত যেন হিম হয়ে গেল সায়েমের। এটা কীভাবে সম্ভব? পরিচিতা কি আগেই জানত যে সে মারা যাবে? তারিখ ১৪ নভেম্বর লেখা। দুর্ঘটনার আগের দিন।

চিঠি পড়তে শুরু করল। ‘প্রিয় সায়েম, তুই আমাকে চিনিস না। কিন্তু আমি তোকে চিনি। প্রতিদিন স্টেট কলেজের সামনের চায়ের দোকানে তুই দাঁড়িয়ে থাকিস। আমি জানি, তুই আমার জন্যই দাঁড়িয়ে থাকিস। আজ সকালে যখন ঘুম থেকে উঠি, দেখি আমার হাতের তালুতে একটা কালো দাগ। মুছতে গেলাম, মুছছে না। তারপর বাসায় ফিরে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। নিজের পেছনে কী যেন দেখলাম একটা ছায়া, কিন্তু সেটা আমার ছায়া নয়। আমি ভয় পাইনি। বুঝতে পেরেছি, আমার চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। এই ডায়েরিতে কিছু রেখে যাচ্ছি তোর জন্য। হয়তো তুই একদিন পড়বি। তখন বুঝবি, আমি তোকে কতটা ভালোবাসতাম।’

চোখ দিয়ে পানি পড়ছে সায়েমের। পাতা ওল্টাল আরও। পরের পাতায় লেখা, ‘আমার শেষ ইচ্ছা—সায়েম, তুই যদি এই ডায়েরি পাস, তাহলে ১৫ ডিসেম্বর রাত ১২টায় আমার কবরে আসিস। তোকে একটা গোপন কথা বলব। কিন্তু একা আসবি। কাউকে বলবি না।’

কবরস্থানে অমাবস্যার রাতের সাক্ষাৎ

১৫ ডিসেম্বর আসতে আসতে সায়েমের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। ওজন কমে গেছে, চোখের নিচে কালি। তবু গায়ে কালো জামা, হাতে পরিচিতার ডায়েরি আর পকেটে টর্চ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। বনানী কবরস্থানে ঢুকতেই গেটের পাহারাদার বাধা দিল। বলল, ‘আমার খুব কাছের মানুষকে বলতে হবে কিছু। দশ মিনিট। প্লিজ।’ পাহারাদার ইশারায় ঢুকতে দিল।

পরিচিতার কবর চেনা কঠিন নয়। নতুন কবর, এখনো সবুজ ঘাস ওঠেনি। কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। ঘড়িতে তখন রাত ১১টা ৫৫ মিনিট। এখনো পাঁচ মিনিট বাকি। শীতের হাওয়া বইছে। কবরস্থানের নীরবতা ভাঙছে দূরের কোনো শেয়ালের ডাক।

ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছুঁই ছুঁই। হঠাৎ টর্চের আলো নিভে গেল। ব্যাটারি শেষ। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তখনই কোত্থেকে যেন একটা আলো আসতে শুরু করল। মৃদু আলো। নীলচে সাদা। কবরের মাথার দিক থেকে। আলো ধীরে ধীরে বাড়ছে, একটা আকৃতি নিচ্ছে। সেটা পরিচিতা! সেই একই চেহারা, সেই একই সাদা ওড়না, সেই একই হাসি। শুধু পা দুটো মাটি স্পর্শ করছে না।

পরিচিতা হাসল। বলল, ‘আমি জানতাম, তুই আসবি। কারণ, তুই আমাকে ভালোবাসিস। আর সেই ভালোবাসাই আমাকে এখানে টেনে এনেছে।’

কাঁপা কাঁপা গলায় সায়েম বলল, ‘তুই আসলি কী করে? তুই তো মরে গেছিস।’ ‘মরে গেছি? সায়েম, আমি তোর জন্যই বেঁচে ছিলাম। এখনো বেঁচে আছি তোর ভালোবাসায়।’

পরিচিতা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে শুরু করল। সায়েম চিৎকার করে বলল, ‘যাস না! আরও কিছুক্ষণ থাক!’ পরিচিতা বলল, ‘যেতে হবে, সায়েম। কিন্তু তুই জানিস, আমি সব সময় তোর কাছেই থাকব। তুই যখন চায়ের দোকানে দাঁড়াবি, যখন আমাকে মনে করবি, আমি তখন তোর পাশে থাকব। আর হ্যাঁ, তোর জন্য একটা উপহার রেখে গেলাম। ডায়েরিটার শেষ পাতা খুলে দেখিস।’

ডায়েরির শেষ পাতায় রহস্যের ইঙ্গিত

আলো মিলিয়ে গেল। হঠাৎ টর্চটা আবার জ্বলে উঠল নিজে থেকেই। সায়েম দৌড়ে কবরস্থান থেকে বেরিয়ে এল। বাড়িতে ফিরে ডায়েরির শেষ পাতা খুলল। সেখানে লেখা, ‘সায়েম, তুই যদি এই লাইনগুলো পড়িস, তাহলে বুঝবি, তুই আমাকে সত্যিই ভালোবাসিস। আমার শেষ উপহার এই ডায়েরি তোর কাছেই থাকল। এর প্রতিটি পাতায় আমি আছি। যখন তুই একলা অনুভব করবি, ডায়েরিটা খুলে পড়বি। আমি তখন তোর সঙ্গে কথা বলব। আর হ্যাঁ, আমার মৃত্যুর পেছনে একটা রহস্য আছে। তুই যদি জানতে চাস, তাহলে আবার কবরস্থানে আসিস। পরের অমাবস্যার রাতে।’

ডায়েরিটা বন্ধ করে দিল সায়েম। মাথা ঘুরছে। কী হচ্ছে? পরিচিতা কি তবে সত্যিই ভূত? না অন্য কিছু? আর এই রহস্য কী?

জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। কুয়াশা এখনো ঘন। দূরে একটা আলো জ্বলে উঠছে। কে জানে, হয়তো পরিচিতাই আবারও ডাকছে! ঠিক করল, পরের অমাবস্যার রাতে আবার যাবে। কারণ, পরিচিতার কথা অসম্পূর্ণ। আরও কিছু জানার আছে। ঘড়িতে তখন ভোররাত চারটা। জানালার বাইরে ধীরে ধীরে আলো ফুটছে।