ছবি লেখকের পাঠানো
শৈশবের স্মৃতি আর হারানো বাবার ছায়া
বিকেলের ম্লান আলোটা যখন ধুলোমাখা জরাজীর্ণ ডায়েরির ওপর উপুড় হয়ে পড়ল, ঠিক তখনই অবশ আঙুল ছুঁয়ে গেল নীল মলাটের এক বিস্মৃত অতীত। ডায়েরিটা খুলতেই হলুদ হয়ে আসা পাতার ভাঁজ থেকে হঠাৎ একটি ক্ষয়িষ্ণু এক টাকার কয়েন আর আমাদের চারজনের অস্পষ্ট ছবিটা মেঝেতে খসে পড়ল। কয়েনটা হাতে নিতেই বুকের ভেতরটা যেন একনিমেষেই হিম হয়ে এল। শৈশবে যা ছিল পৃথিবীর সব সুখের চাবিকাঠি, আজ ছাব্বিশে দাঁড়িয়ে সেই এক টাকার মুদ্রা কেবল একটুকরো দগ্ধ স্মৃতির প্রতিচ্ছবি।
২০০৬ সালের সেই ভোর
মানসপটে একলহমায় ভেসে ওঠে ২০০৬ সালের সেই হাড়কাঁপানো ভোরের কথা। অক্ষরবৃত্তের জগতে সবেমাত্র পা রাখা দিনগুলোতে আমি তখন বর্ণমালা চিনতে শেখা এক সরল শৈশব। ভোরের সেই ধূসর কুয়াশায় নিজের চোখে অচেনা এক চরম শূন্যতা দেখেছিলাম। মাথার ওপর অতন্দ্রপ্রহরীর মতো ছায়া দেওয়া বটবৃক্ষটি সেদিন হঠাৎ করেই স্তব্ধ হয়ে গেলেন। একেবারে আমার চোখের সামনে। তখন পৃথিবীটাকে চেনা বা মৃত্যুকে বোঝার ক্ষমতা হয়ে ওঠেনি, কিন্তু এটুকু অনুভব করেছিলাম যে মাথার ওপর থেকে বিশাল এক নীল আকাশ হঠাৎ করেই যেন সহস্র টুকরো হয়ে ছিঁড়ে পড়েছে। সেই ভোরেই আমার শৈশবটা অকালপক্ব এক গাম্ভীর্যের চাদরে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
বাবার ছায়া আর নিঃসঙ্গ লড়াই
স্কুলে পা রাখার দিনগুলো থেকে আজ অবধি এক অদম্য তৃষ্ণা আমাকে তাড়া করে ফেরে। যখন দেখতাম, সহপাঠীরা দৌড়ে গিয়ে তাদের পিতার হাত ধরছে কিংবা বুক চিরে সেই পরম নির্ভরতার ডাকটি ডাকছে, তখন আমার ভেতরের জগৎটা এক অস্ফুট যন্ত্রণায় ভেঙে চুরমার হয়ে যেত। আমি তো চাইলেও আর কোনো দিন ওই শব্দ উচ্চস্বরে উচ্চারণ করতে পারব না! পৃথিবীতে আর কেউ নেই, যাঁকে আমি সেই স্বর্গীয় অধিকার নিয়ে ডাকতে পারি। অন্যের বাবার ছায়া দেখে নিজের রিক্ততাকে নিভৃতে দহন করা, এই দীর্ঘশ্বাস আমাকে এক অশরীরী আত্মার মতো তাড়া করে ফিরছে। এই গভীর অভিমান আর না বলা কথাগুলোই আজ আমার অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভাই আরিয়ানের ছায়া
ডায়েরির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ একটা জায়গায় এসে আঙুল থমকে দাঁড়াল। সামনে আমার চিরকালের সেই ছায়াঢাকা আশ্রয়—বড় ভাই আরিয়ান, যার গম্ভীর শাসনের আড়ালে সব সময় একসমুদ্র প্রশ্রয় লুকিয়ে থাকত। মা আর ভাইয়া—এই দুজন মানুষকে ঘিরেই তো আমার পৃথিবী নামক ছোট্ট গ্রহটা ঘুরপাক খাচ্ছে। মাঝে মাঝে ভাবি, ভাইয়া মানুষটা আসলে এক অদ্ভুত জাদুকর। আমার যত অগোছালো জেদ, এলোমেলো কান্না আর অর্থহীন অভিমান, সব তিনি কোনো এক অদৃশ্য সুতায় গেঁথে একলহমায় শান্ত করে দেন। মনে পড়ে, একবার এক মেঘলা দুপুরে আমি যখন খুব মন খারাপ করে বারান্দায় বসে ছিলাম, ভাইয়া পাশে এসে খুব নিচুস্বরে বলেছিলেন, ‘তুষি, অকারণ ভয় পাচ্ছিস কেন? আমি তো আছি।’ খুব সাধারণ একটা কথা, অথচ সেই একটা কথায় সেদিন আমার মনের সবটুকু মেঘ রোদেলা হয়ে গিয়েছিল।
বড় হওয়ার দহন
কিন্তু আজ ছাব্বিশ বছরে এসে এক অদ্ভুত দহন আমাকে পুড়িয়ে মারছে। বড় হয়ে যাওয়াটা বোধ হয় খুব একটা সুখের বিষয় নয়। চারপাশের মানুষ যখন সাফল্যের মরীচিকার পেছনে দৌড়াচ্ছে, আমি তখন বিষণ্ন চোখে তাকিয়ে দেখি, প্রিয় মানুষদের জন্য আজও আমি একচিলতে নিশ্চিন্ত আকাশ তৈরি করতে পারিনি। এক অমোঘ গ্লানি প্রতি রাতে আমার বালিশের পাশে এসে বসে থাকে। মনের গহিনে এক গোপন হাহাকার নিয়ে ভাবি, আমি কি আদৌ পারব তাঁদের এই পর্বতপ্রমাণ ভালোবাসার একবিন্দু ঋণ কোনো দিন শোধ করতে?
মায়ের নীরব ত্যাগ
আমার মা, যাঁর উপস্থিতি তপ্ত দুপুরে শ্রাবণের শীতল মেঘের মতো। মনে পড়ে, যখন অন্ধকার কাটেনি, নিশির ডাকও থামেনি, ঠিক তখনই তাঁর শয্যাত্যাগের মৃদু শব্দে আমার কাঁচা ঘুম ভাঙত। রান্নাঘর থেকে আসত চুড়ির সেই টুংটাং শব্দ আর মসলার হালকা ঘ্রাণ। সরকারি চাকরির সেই যান্ত্রিক পরিশ্রমে যাওয়ার আগে আমাদের টিফিন আর উদরপূর্তির আয়োজন করাই ছিল তাঁর প্রাত্যহিক যুদ্ধ। তারপর টানা দুই ঘণ্টার ধুলাবালুমাখা পথ পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে যাওয়া। রাত আটটায় যখন দরজায় কড়া নাড়তেন, দেখতাম ঘামে ভেজা মুখটায় একরাশ ক্লান্তি, অথচ আমাদের দেখলেই একচিলতে হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ‘আরিয়ান, তুষিকে পড়িয়েছিস তো? তোরা খেয়েছিস?’ তাঁর এই নীরব ত্যাগের মহিমা মাপার মতো কোনো ফিতা আজ অবধি আবিষ্কৃত হয়নি। আজ বড্ড অনুশোচনা হয়, কেন আমি আরও আগে নিজের মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই নিঃশব্দ ভারটা নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারলাম না!
ভুল আর শেখা
এই দীর্ঘ পরিক্রমায় অনেক সময় আমি খেই হারিয়েছি। কখনো মরীচিকার পেছনে হন্যে হয়ে ছুটেছি, কখনো ভুল মানুষদের অন্ধের মতো বিশ্বাস করে নিজের সাজানো জগৎটাকে এলোমেলো করে ফেলেছি। জানি না সামনের পথটা কতটা বন্ধুর, তবে বুঝতে পেরেছি, জীবনটা কোনো সহজ গাণিতিক সমীকরণ নয়। জীবন মানে সেই ছোট্টবেলার ভোরের স্মৃতি আর বড় হওয়ার নিঃসঙ্গ লড়াইয়ের এক জটিল রসায়ন। ভুলগুলোর দহন আজ একেকটি বিষাক্ত ক্ষত হয়ে ডায়েরির এই জীর্ণ পাতার মতো আমার ভেতরটা কুরে কুরে খায়। আজ হাতে দামি স্মার্টফোনের উজ্জ্বলতা আছে, ভার্চ্যুয়াল জগতের মোহময় হাতছানি আছে, কিন্তু সেই চিরচেনা গম্ভীর কণ্ঠস্বর কোথাও নেই।
ফিরে যেতে চাই ২০০৬-এর আগে
যদি কোনো অলৌকিক ক্ষমতা পেতাম, তবে রাজপ্রাসাদ চাইতাম না। শুধু চাইতাম ২০০৬ সালের আগের সময়টায় ফিরে যেতে। বাবার আঙুল ধরে খোলা মাঠে হাঁটতে হাঁটতে চুপিচুপি বলতাম, জানো বাবা, বড় হয়ে যাওয়া মানে যে এতটা নিঃসঙ্গতা, এতটা অনিশ্চয়তা, তা যদি জানতাম, তাহলে কোনো দিনও স্কুলের প্রথম পাঠের দিনগুলো থেকে আর এক পা-ও সামনে বাড়াতাম না। তার চেয়ে তোমার আঙুল ধরে কুয়াশামাখা ভোরে দাঁড়িয়ে থাকাটাই ভালো।
নতুন শক্তির সন্ধান
ছাব্বিশের এই বেলা শেষে দাঁড়িয়ে আজ স্পষ্ট বুঝতে পারছি, জীবন মানে কেবল দুহাত ভরে প্রাপ্তি নয়। জীবন মানে হারানো ছায়ার মায়া কাটিয়ে নিজের ভেতর এক নতুন শক্তিকে জাগিয়ে তোলা। শৈশবে ফেরা অসম্ভব, কিন্তু সেই নিঃশব্দ ভালোবাসার আঁচল আর নির্ভরতায় নিজেকে নতুন করে গড়াই আমার বেঁচে থাকার আনন্দ। তাঁদের দুজনকে ঘিরেই আমার এই ছোট্ট পৃথিবী আর কিচ্ছু না হোক, এই মায়ার জগৎটুকু আমৃত্যু পরম মমতায় আগলে রাখতে পারলেই আমার জীবনটা অন্তত বৃথা যাবে না।
লেখক: ইল্লিন জাহান উর্মি, বাংলা বিভাগ, প্রথম ব্যাচ, নেত্রকোনা বিশ্ববিদ্যালয়, নেত্রকোনা



