বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ পল্লীগাথা সংগ্রহ করে বাংলার লোকসংস্কৃতিকে অমর করে গেছেন চন্দ্রকুমার দে। তার সংগ্রামী জীবন ও অসামান্য অবদানের কাহিনী তুলে ধরেছেন ড. মোঃ রুহুল আমিন সরকার।
পল্লীগাথার সন্ধানে চন্দ্রকুমার দে
১৯১৩ সালে ময়মনসিংহ জেলার 'সৌরভ' পত্রিকায় চন্দ্রকুমার দে প্রথম চন্দ্রাবতী নামের এক প্রাচীন মহিলা কবির কথা লিখেন। সেই লেখায় গ্রামের ফুলের মতো মাধুর্য ছিল, যা পড়ে লেখকের চোখে জল এসে গিয়েছিল। এরপর লেখকের মনে প্রশ্ন জাগে—চন্দ্রকুমার দে কে? আর কেনারামের কবিতা কোথায় পাওয়া যাবে?
'সৌরভ' পত্রিকার সম্পাদক কেদারনাথ মজুমদারের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি জানান, চন্দ্রকুমার দরিদ্র একজন যুবক। তিনি বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি, কিন্তু নিজের চেষ্টায় বাংলা লেখা শিখেছেন। তিনি মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন এবং কাজ করতে পারছিলেন না। চন্দ্রকুমারের লেখার ভাষা খুব আকর্ষণীয় ছিল এবং তিনি গ্রামের কবিতাকে খুব ভালোবাসতেন।
লেখক যখন ময়মনসিংহের অন্যদের কাছে এসব গানের কথা জানতে চান, তখন কেউ তেমন কিছু বলতে পারেনি। অনেক শিক্ষিত মানুষ এসব গানকে তুচ্ছ করতেন, তাদের মতে এগুলো গ্রামের সাধারণ মানুষ গায়, এতে বিশেষ কিছু নেই। তাই তারা এসব সংগ্রহ করার প্রয়োজন মনে করতেন না।
কিন্তু লেখক আশা ছাড়েননি। দুই বছর পর তিনি কেদারনাথের কাছ থেকে একটি চিঠি পান, যাতে লেখা ছিল চন্দ্রকুমার কিছুটা সুস্থ হয়েছেন এবং শীঘ্রই কলকাতায় আসবেন।
কলকাতায় আগমন ও চিকিৎসা
চন্দ্রকুমার তার স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে যাত্রার খরচ জোগাড় করেন। ১৯১৯ সালে তিনি কলকাতায় আসেন, তখন তিনি খুব দুর্বল ছিলেন এবং অসুখে ভুগছিলেন। ঠিকমতো খেতেও পারতেন না। কিন্তু তিনি গ্রামের অনেক গল্প ও গানের কথা জানতেন। তার কাছ থেকে লেখক ময়মনসিংহের অজানা পল্লীগাথার খবর পান। তখন থেকেই তিনি লেখকের খুব প্রিয় হয়ে ওঠেন।
কলকাতায় তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। যামিনীভূষণ রায় কবিরাজ বিনা খরচে চিকিৎসা করেন এবং গোপালদাস চৌধুরী তাকে থাকার জায়গা দেন। কিছুদিন পর তিনি আবার দেশে ফিরে যান এবং এই সময়ে তিনি অনেক কষ্ট করে পল্লীগাথা সংগ্রহ করেন।
পল্লীগাথার বৈশিষ্ট্য
এই গানগুলো মূলত কৃষকদের রচনা। অনেক গান কখনও লেখা হয়নি, মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। আগে গ্রামে এসব গান খুব জনপ্রিয় ছিল, মানুষ কাজের ফাঁকে দাঁড়িয়ে গান শুনত। কিন্তু এখন মানুষের আগ্রহ কমে গেছে এবং যারা গান গাইত, তাদের সংখ্যাও কমে গেছে। ফলে অনেক গান হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
একটি পূর্ণ পালাগান সংগ্রহ করতে হলে অনেক গ্রামে যেতে হয় এবং বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে অংশ অংশ করে সংগ্রহ করতে হয়। এ কাজ খুব কষ্টের, কিন্তু চন্দ্রকুমার এই কাজ করতে গিয়ে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন।
শুরুর দিকে তিনি সংস্কৃতভিত্তিক বড় বড় কাব্যের দিকে বেশি মন দিতেন, যেমন—দুর্গাপুরাণ, মনসার ভাসান, উমার বিবাহ ইত্যাদি। তিনি ভাবতেন এগুলো হারিয়ে গেলে ক্ষতি হবে। কিন্তু গ্রাম্য ছড়াগুলোকে তিনি একটু কম গুরুত্ব দিতেন, কারণ তিনি ভয় পেতেন—শিক্ষিত সমাজ এসবকে তুচ্ছ ভাববে।
তিনি একবার লেখককে চিঠিতে লিখেছিলেন—গ্রামের ভাষা খুব সহজ এবং কখনও কখনও অগোছালো, শুনলে হাসি পায়। এগুলো সংগ্রহ করা উচিত কি না, তা জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লেখক তাঁকে উৎসাহ দেন এই গ্রামীণ গানগুলো সংগ্রহ করতে, কারণ এই গানগুলোর মধ্যেই আসল বাঙালি জীবনের ছবি আছে।
পল্লীগাথাগুলো খুবই স্বাভাবিক ভাষায় লেখা, এখানে কৃত্রিমতা নেই। এগুলো মানুষের জীবনের গল্প। লেখক মনে করেন, এসব গান খাঁচার পাখির মতো নয়, বরং খোলা আকাশের কোকিলের গান।
চন্দ্রকুমারের জীবন ও সংগ্রাম
চন্দ্রকুমার দে ১৮৮৯ সালে নেত্রকোণার আইথর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অল্প পড়াশোনা করে তিনি মুদির দোকানে কাজ করেন এবং পরে তহশিলদার হিসেবে কাজ পান। এই কাজের মাধ্যমে তিনি কৃষকদের সঙ্গে মিশতে পারেন এবং তাদের গান শুনে মুগ্ধ হন। এইভাবেই তার মনে পল্লীগানের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। পরে তিনি খুব সুন্দর বাংলা লিখতে শিখে ফেলেন।
স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সহায়তায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পল্লীগাথা সংগ্রহের কাজ পান। তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ পালাগান সংগ্রহ করেন, যেমন—মহুয়া, মলুয়া, কমলা, কেনারাম, কাজলরেখা, দেওয়ানা মদিনা ইত্যাদি। সব মিলিয়ে তার সংগ্রহে প্রায় ১৭ হাজারের বেশি পঙক্তি আছে।
এই পালাগুলোর অনেকই বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে লেখা। অনেক দুঃখ-কষ্টের গল্প এখানে আছে। গ্রামের মানুষ এসব গল্প শুনে কাঁদত। কবিরা হয়তো ছন্দে খুব দক্ষ ছিলেন না, কিন্তু তাঁদের হৃদয়ে ছিল গভীর অনুভূতি। এই গল্পগুলো শুনলে আজও মানুষের চোখে জল আসে।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের ভৌগোলিক বিবরণ
ময়মনসিংহ অঞ্চলের উত্তরে গারো পাহাড় ও খাসিয়া পাহাড়। এই অঞ্চল দিয়ে অনেক নদী প্রবাহিত হয়েছে—যেমন সোমেশ্বরী, কংস, ধনু, ফুলেশ্বরী, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ইত্যাদি। এই এলাকায় অনেক বিল ও জলাশয় আছে, যাকে 'হাওর' বলা হয়, যেমন—তলার হাওর, জেলের হাওর ইত্যাদি।
এই অঞ্চলেই বেশিরভাগ পালাগানের ঘটনা ঘটেছে, বিশেষ করে সুষঙ্গ-দুর্গাপুর, নেত্রকোণা ও কিশোরগঞ্জ এলাকায়।
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, এই পল্লীগাথাগুলো আমাদের দেশের অমূল্য সম্পদ। এগুলোতে আমাদের গ্রামের জীবন, দুঃখ-কষ্ট, ভালোবাসা এবং সংস্কৃতির আসল রূপ ফুটে উঠেছে। চন্দ্রকুমার দে এই অমূল্য সম্পদ সংগ্রহ করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। এজন্য তিনি বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান লাভ করেছেন।



