ইরামের গল্প: সাহিত্য সম্পাদকের প্রত্যাখ্যান ও অন্ধ ফকিরের উৎসাহ
ইরামের গল্প: সম্পাদকের প্রত্যাখ্যান ও ফকিরের উৎসাহ

ইরামের সাহিত্য যাত্রা: প্রত্যাখ্যান থেকে আশার আলো

অত্যন্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে ইরাম ‘ঊষার রশ্মি’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকের কাছে তার প্রথম গল্পটি জমা দিল। সম্পাদক তাকে বললেন, ‘আপনিই পড়ে শোনান, পছন্দ হলে এখনই জানিয়ে দেব।’ সামান্য ইতস্তত করে ইরাম জানাল, ‘কাহিনিগুলো বাস্তব থেকে নেওয়া।’ সম্পাদকের ‘পড়ুন দেখি আগে’ বলায় উৎসাহিত হয়ে ইরাম পড়তে শুরু করল। সাহিত্য সম্পাদক ও তার দুই আঁতেল বন্ধু গল্প শুনতে মনোযোগ দিলেন।

গল্পের বিষয়: তিন নারীর আড্ডা ও অভিজ্ঞতা

গল্পে তিন নারীর কথা বলা হয়েছে, যারা সমমনা হলেও সমবয়সী নয়। দুজন চাকরিজীবী, আরেকজন সদ্য চাকরি পেয়েছে কিন্তু এখনো যোগ দেয়নি। কর্মরত দুজন দুপুরের খাবারের পর নানা অছিলায় আধা বেলার ছুটি নিয়ে নতুন কর্মপ্রাপ্তাকে পরামর্শ দিতে ও গল্প করতে ছয়তলার ব্যালকনিতে জমায়েত হয়। তাদের আলাপে উঠে আসে রান্নাবান্না, ফ্যাশন, গৃহশৈলীসহ নানা বিষয়। তাদের গল্প ও হাসির টুকরো শাশুড়ির কানে পৌঁছালে তিনি কান পাতলেন, ভাবলেন কী এমন কথা যা শুনতে দিতে চায় না।

শাশুড়ি ভাবলেন, খুঁত নিয়ে হাসাহাসি তিনি সহ্য করতে পারেন না, কারণ জগতে কেউ নিখুঁত নয়। তার ছোটবেলার এক ঘটনা মনে পড়ল, যখন এক মেয়ে চশমা পরা অন্য মেয়েকে ‘চারচোখা’ বলে খেপাত, পরে সেই মেয়ের সন্তানেরও চশমা লাগল। শাশুড়ি বুঝলেন, মেয়েরা বাইরের জগতের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছে, নিজেদের নিরাপত্তার কৌশল শেয়ার করছে। তিনি স্বস্তি পেলেন, ভাবলেন মেয়েরা বাইরে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করে, কিন্তু ঘরের ভেতর নিকট আত্মীয়ের অশালীন আচরণে চুপ থাকে সংসারের শান্তির জন্য।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শাশুড়ির গোপন খাতা ও অভিজ্ঞতা

শাশুড়ি তার মলিন খাতাটি হাতে নিলেন, যাতে ‘অলৌকিক বিড়াল’ নামে দুটি ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে। এক ঘটনায় তার বান্ধবী কিশোরী বয়সে এক জ্ঞাতি ভাইয়ের হাত থেকে বিড়ালের ঝাঁপ দেওয়ায় রক্ষা পায়। অন্যটিতে তার নিজের অভিজ্ঞতা, যখন ননাসজামাই তাকে হেনস্থা করতে চাইলে বাড়ির পোষা বিড়াল হস্তক্ষেপ করে। তিনি এই গোপন কথা মেয়েদের জানাতে চান, ভাঙা পা ও ভীরু মন নিয়ে এগোচ্ছেন।

সম্পাদকের প্রত্যাখ্যান ও ইরামের হতাশা

ইরামের গল্প শেষ হলে সম্পাদকের চেহারায় কঠোরতা নেমে এল। এক বন্ধু বললেন, ‘বাহ্, এই গল্প নারীবাদী তাত্ত্বিকদের কাজে লাগবে!’ সম্পাদক বিরক্তি নিয়ে বললেন, ‘শুনুন, আমি গল্পের কারবারি। গল্প বলুন, সত্য ঘটনা জানার দরকার কী?’ অন্য বন্ধু নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘The Old Man and the Sea’ বইয়ের উদাহরণ দিলে সম্পাদক এড়িয়ে গিয়ে ইরামকে বললেন, ‘আপনি যান এখন। পারলে নতুন গল্প, সত্য নয়, গল্পই লিখে আনবেন।’

কষ্ট চেপে ইরাম উঠে দাঁড়াল, বই ও লেখকের নাম বলে বাসায় ফিরল। হতাশায় সে শুয়ে রইল, বিকেলে গল্প লেখা কাগজ জ্যাকেটের পকেটে পুরে বের হলো। মা তাকে খাওয়ার জন্য ডাকলেন, কিন্তু ইরাম শুনল না। রেললাইনের কিনার দিয়ে হেঁটে সে তার বন্ধু ঈষাণীর বাড়িতে পৌঁছাল।

ঈষাণীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও অন্ধ ফকিরের উপস্থিতি

ঈষাণীর বাড়ির গেটে এক অন্ধ ফকির বসে ছিল। ঈষাণী বলল, ফকির যেদিন আসে, সেদিন তার শখের পুরির দোকানে ভিড় হয়। ইরাম আজকের ঘটনা বললে ঈষাণী গল্পটা পড়ে শোনাতে বলল। শুনে মুগ্ধ হয়ে ঈষাণী বলল, ‘বাহ্ ভালো লিখেছিস।’ কিন্তু ইরাম হতাশ হয়ে বলল, ‘এটাও ছিঁড়ে ফেলব, পুড়িয়ে ফেলব।’ তারা ডালপুরি খেল, তখন ইরাম দেখল অন্ধ ফকির উঠে দাঁড়িয়েছে, হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি।

অন্ধ ফকিরের উৎসাহ ও আশার বার্তা

ইরাম ফকিরের পিছু নিল। গলিতে ঢুকে সে গল্প লেখা কাগজ মোমবাতির আগুনে ধরতে চাইলে ফকিরের আরেক হাত বেরিয়ে এসে কাগজটা নিয়ে নিল। ফকির বলল, ‘কেউ একজন বোঝেনি বলে নিজের কষ্ট করে তৈরি জিনিস নষ্ট করবে, মা? এ কেমন কথা! একজন বুঝল না, তাতে কী? অন্য কেউ বুঝবে, আজ মর্যাদা দিল না, তো কী? আগামীকাল দেবে।’

কথা শেষ করে ফকির উধাও হলে ইরাম বিহ্বল হয়ে রইল। তখনই এক রিকশা গলিতে ঢুকল, ইরাম তাতে উঠে পড়ল। ফকিরের কথা তার কানে বাজতে লাগল, ‘আজ মর্যাদা দিল না, তো কী? আগামীকাল দেবে।’ এই আশার বার্তা নিয়ে ইরাম ফিরে চলল।