আশরাফ সিদ্দিকীর বংশপরিচয়: লোককথায় মোড়ানো এক সাহিত্যিকের উত্তরাধিকার
আশরাফ সিদ্দিকীর বংশপরিচয়: লোককথার উত্তরাধিকার

আশরাফ সিদ্দিকীর বংশপরিচয়: লোককথায় মোড়ানো এক সাহিত্যিকের উত্তরাধিকার

একটি বৃষ্টিস্নাত বিকেলে ধানমন্ডির ৫৫১ নম্বর বাসার বারান্দায় বসে ড. আশরাফ সিদ্দিকীর সঙ্গে তাঁর পাঁচ সন্তানের তুমুল বাহাস চলছিল। সালটা সম্ভবত ১৯৭৭। বাহাসের বিষয় ছিল সিদ্দিকী পরিবারের পূর্বপুরুষের পরিচয়। বাবা দৃঢ় কণ্ঠে বলছিলেন, ‘আমরা পীরের বংশ। আমাদের পূর্বপুরুষ শেখ নান্নু ব্রাহ্মণ-শাসনে শায়িত আছেন। তিনি বাগদাদ থেকে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এখানে এসেছিলেন।’

পারিবারিক বাহাস ও প্রশ্নের জন্ম

বড় ছেলে রুমি কবজি ঘুরিয়ে ক্রিকেট বল ছোড়ার ভঙ্গি করতে করতে হঠাৎ বলে উঠল, ‘বাবা, এগুলো সব মিথ।’ উত্তেজিত বাবা জবাব দিলেন, ‘তাই বলছ? তাহলে চলো, দেখিয়ে আনি তাঁর কবর।’ বড় মেয়ে রিমা মন্তব্য করল, ‘সে তো আমরা দেখেছি। বহুবার তুমি আমাদের নিয়ে গেছ।’ কিন্তু রুমির প্রশ্ন ছিল ভিন্ন। তিনি জানতে চাইলেন, শেখ নান্নু কি আদৌ বাগদাদ থেকে এসেছিলেন? নাকি তিনি ছিলেন মোগল সৈন্য, যিনি পালিয়ে বাংলায় নতুন জীবন শুরু করেছিলেন?

বাবা কিছুটা রেগে বললেন, ‘তোমাদের জেনারেশনের সমস্যা এটাই। তোমরা কিছুই বিশ্বাস করতে চাও না। সম্মান করতে জানো না। আমাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস লেখা আছে আবদুল করিম খানের তরফ গৌরাঙ্গীর ইতিহাস বইয়ে।’ বইটি তখন ছিল চাচাতো ভাই খালেদের কাছে। সেদিনের আলাপ অমীমাংসিত রয়ে গেল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বইয়ের সন্ধান ও বংশলতিকার উন্মোচন

বাবার মৃত্যুর পর ২০২০ সালে তাঁর বইয়ের ভান্ডার গোছাতে গিয়ে চোখে পড়ল তরফ গৌরাঙ্গীর ইতিহাস বইটি। দ্বিতীয় সংস্করণটি পুনর্মুদ্রণ করেছিলেন আবদুল করিম খানের ছেলে বুলবুল খান। বইটি হাতে নিয়ে সিদ্দিকী পরিবারের সদস্য দারুণ উৎসাহে পাতা ওলটাতে শুরু করলেন। জানা গেল, তাদের বংশলতিকা শুরু হয় ঘাটাইল থানার ব্রাহ্মণ-শাসন এলাকা থেকে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শেখ নান্নু ধর্ম প্রচারের জন্য বাগদাদ থেকে ঘাটাইলে এসেছিলেন। সে সময়ে ব্রাহ্মণদের আধিপত্য ছিল প্রবল। নিম্নবর্ণের হিন্দু ও মুসলমানরা শোষিত হতো। শেখ নান্নু কুলীন ব্রাহ্মণদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে শান্তির পথে চলতে আহ্বান জানালেও তারা গুরুত্ব দেয়নি। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, তিনি তাঁর অলৌকিক ক্ষমতায় ব্রাহ্মণদের শাসন করেন, যার ফলে তাদের প্রতিপত্তি বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।

লাখেরাজ প্রাপ্তি ও পরিবারের বিস্তার

পরবর্তীতে বাদশাহর কাছ থেকে শেখ নান্নু সেই গ্রাম ও আশপাশের আরও দুটি গ্রামের লাখেরাজপ্রাপ্ত হন। লাখেরাজ এমন একটি ভূমিব্যবস্থা, যেখানে কর দিতে হতো না। তাঁর দুই পুত্র আলী মাহমুদ ও ওলী মাহমুদ ইসলাম প্রচারের জন্য টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। ওলী মাহমুদ দরবেশ শেখ কালের কন্যাকে বিয়ে করেন এবং কালিহাতী থানার নাগবাড়িতে বসতি গড়ে তোলেন।

ওলী মাহমুদের পৌত্র গোলাম মুর্তুজা ছিলেন নায়েবে নাজিম। একবার খাজনা আদায় করে ফেরার পথে বঙ্গরার মীর তোফেল আলীর বিষাক্ত বাণে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে তিনি মারা যান। রানি ভবানী তাঁর আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে পরিবারকে তিনটি গড় উপহার দেন। গোলাম মুর্তুজার সন্তান এবাদত উদ্দিন সিদ্দিকী জমিদারি ক্রয় করে চৌধুরী পদবি লাভ করেন।

আশরাফ সিদ্দিকীর বংশীয় সংযোগ

এবাদত উদ্দিন সিদ্দিকীর সন্তান ছিলেন আবদুল হামিদ চৌধুরী, যিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার ছিলেন। আর তাঁর পৌত্র ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। অন্যদিকে, সলিম উদ্দিন সিদ্দিকী ছিলেন সংসারবিরাগী দরবেশ এবং তিনি আশরাফ সিদ্দিকীর দাদা। আশরাফ সিদ্দিকীর বাবা সাত্তার সিদ্দিকী বিয়ে করেছিলেন তাঁর আপন চাচাতো বোন সমীরণ নেসাকে, যিনি এবাদত উদ্দিন সিদ্দিকীর নাতনি ছিলেন।

বাবার প্রতি গভীর সম্মান ও উত্তরাধিকার

বংশলতিকার এই অংশ পড়ে শেষ করে লেখক এক অভূতপূর্ব অনুভূতি লাভ করেন। নিজের বংশের প্রতি বাবার গভীর সম্মান ও আস্থা মৃত্যুর পর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাবার শেষ জীবনে এক সাক্ষাত্কারে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর সাধ ছিল স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া এবং জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনের। যদিও তিনি এ জন্য কোনো আফসোস করেননি।

২০২৬ সালে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তির পর লেখক আনন্দে সারা রাত জেগে বাবার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘বাবা, তুমি নিজ হাতে এই পুরস্কার গ্রহণ করতে পারলে নিশ্চয়ই খুশি হতে। আমরাও হতাম। তবে তোমার সন্তান হিসেবে এই পুরস্কার গ্রহণের সুযোগ পেয়ে আমি ধন্য, আমি গর্বিত।’

আশরাফ সিদ্দিকী জীবনে একুশে পদক, ইউনেসকো সাহিত্য পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা পেয়েছেন। শেখ নান্নুর বাগদাদ থেকে আসার কাহিনি বা ব্রাহ্মণদের শাসনের গল্প আসল বিষয় নয়। বরং আশরাফ সিদ্দিকীর জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা লোককথা ও লোককাহিনিই তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের মূলভিত্তি। বাবাকে বুঝতে পেরে লেখকের মন ভরে যায় গভীর সন্তোষে।