বার্লিনে মেয়ের সঙ্গে দেখা: দশ দিনে তিন দেশ ভ্রমণের গল্প
বার্লিনে মেয়ের দেখা: দশ দিনে তিন দেশ ভ্রমণ

মেয়ে পড়াশোনা করছে বার্লিনে। দুবাইয়ের জুন মাসের প্রচণ্ড গরম থেকে কয়েক দিনের জন্য মুক্তি পেতে ভাবলাম, তার কাছে একটু ঘুরে আসি। এক ঢিলে দুই পাখি—মেয়ের সঙ্গে দেখা হবে, পাশাপাশি ইউরোপের কয়েকটি শহরও ঘুরে দেখা যাবে। অনেকটা রথ দেখা আর কলা বেচার মতোই।

যাত্রা শুরু: শারজা থেকে বার্লিন

সময় মাত্র দশ দিন, আর গন্তব্য তিন দেশ—জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরি। ৪ জুন, প্রায় মধ্যরাত। শারজা বিমানবন্দরের আলো ঝলমল করছে। এই বিমানবন্দরের ইতিহাসও কম সমৃদ্ধ নয়। ১৯৩২ সালে ব্রিটিশ ইম্পেরিয়াল এয়ারওয়েজের মধ্যপ্রাচ্য রুটের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টপেজ ছিল এটি। মরুভূমির বুকে ছোট্ট একটি রানওয়ে থেকে আজকের আধুনিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—পরিবর্তনের এই গল্প ভাবতেই ভালো লাগে।

আমি আর আমার সহধর্মিণী বোর্ডিং গেটে বসে আছি। চারদিকে হাজারো যাত্রীর মেলা। মনে হচ্ছিল, যাত্রা শুরু হওয়ার আগেই যেন ভ্রমণের সুবাস চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কাতার এয়ারওয়েজের উড়োজাহাজ উড্ডয়নের এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে আমাদের নামিয়ে দিল দোহায়। সেখানে দুই ঘণ্টার যাত্রাবিরতির পর আবার আকাশে। প্রায় সাত ঘণ্টার দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে যখন বার্লিনে পৌঁছালাম, তখন সকাল। কিন্তু সেই সকালের আলো যেন নতুন এক পৃথিবীর দরজা খুলে দিল।

বার্লিনে পৌঁছে: মেয়ের আলিঙ্গন

ইউরোপে ইমিগ্রেশনে এখন আর পাসপোর্টে সিল মারা হয় না; বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনেই নিয়ম। ভেবেছিলাম বেশ সময় লাগবে, তাই মেয়েকে বলেছিলাম তাড়াহুড়া না করতে। কিন্তু সব আনুষ্ঠানিকতা খুব দ্রুতই শেষ হয়ে গেল। খবর দিতেই সে এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দিল।

আমি কাঁচঘেরা আগমন লাউঞ্জের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ দেখি, মেয়ে দৌড়ে এসে আমাদের জড়িয়ে ধরল। তার হাতে রঙিন কাগজে লেখা—"Welcome to Berlin"। মুহূর্তেই সব ক্লান্তি উধাও। মনে হলো এত দিন পর এই আলিঙ্গনের অপেক্ষাই ছিল সবকিছুর চেয়ে বড়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এয়ারপোর্টের লাগোয়া Bahnhof, অর্থাৎ মেট্রোস্টেশন। আমরা আগে থেকেই Deutsche Bahn-এর মাসিক টিকিট কেটে রেখেছিলাম। এই টিকিটে জার্মানির যেকোনো শহরে ট্রেন, মেট্রো ও বাসে ভ্রমণ করা যায়। জার্মানির গণপরিবহন–ব্যবস্থা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার—সময়নিষ্ঠ, পরিচ্ছন্ন এবং ব্যবহারবান্ধব।

ফ্রি মার্কেটে দেশি ভাইয়ের দেখা

মেট্রো থেকে নেমেই চোখে পড়ল একটি ফ্রি মার্কেট। দোকানদারেরা অস্থায়ী স্টল সাজিয়ে বসেছেন নানা ধরনের পসরা নিয়ে। কেউ বিক্রি করছেন তাজা ফল, কেউ পুরোনো বই, কাপড় কিংবা হস্তশিল্প। ফলের দামও সুপারমার্কেটের তুলনায় কম। কিনে ফেললাম চেরি আর স্ট্রবেরি।

একটু দূরে তাকিয়ে দেখি, ম্যাডাম এক দোপাট্টা বিক্রেতার সঙ্গে হাত নেড়ে নেড়ে বেশ গল্প করছেন। অবাক হয়ে ভাবলাম, এ দেশের মাটিতে পা দিয়েই তিনি জার্মান ভাষা কবে রপ্ত করলেন! আমার আগের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেকেই অন্য ভাষায় কথা বলতে অনাগ্রহী। কাছে গিয়ে দেখি, দোকানদার আমাদেরই দেশি ভাই। প্রায় ৩০ বছর আগে জার্মানিতে এসেছেন। এখানেই শিকড় গেড়েছেন, সংসার গড়েছেন। প্রতি শুক্রবার এই অস্থায়ী মার্কেটে স্টল দেন।

যাত্রার শুরুতেই এক দেশি ভাইয়ের সঙ্গে দেখা! বিদেশের মাটিতে হঠাৎ কোনো স্বদেশের মুখ দেখতে পাওয়া এক অন্য রকম উষ্ণতা এনে দেয়। মনে হয় নিজের মানুষ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই ছড়িয়ে আছে।

জুমার নামাজ ও কমিউনিটি সেন্টার

বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল প্রায় ১০টা। সারা রাতের যাত্রায় শরীর ক্লান্ত, চোখে ঘুম। কিন্তু সেদিন ছিল শুক্রবার। মেয়েকে আগেই জানিয়েছিলাম, জুমার নামাজ আদায় করতে চাই। সে গুগল ম্যাপে খুঁজে সবচেয়ে কাছের মসজিদের ঠিকানা বের করল।

গিয়ে দেখি এটি প্রচলিত অর্থে মসজিদ নয়; বরং একটি কমিউনিটি সেন্টারকে নামাজের জন্য ব্যবহার করা হয়। যথারীতি এর ব্যবস্থাপনায় তুরস্কের ভূমিকা রয়েছে। ইউরোপজুড়েই মসজিদ ও ইসলামিক কমিউনিটি সেন্টার পরিচালনায় তুরস্ক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

মাশাআল্লাহ, মুসল্লিদের ভিড় উপচে পড়ছে। একটু দেরি হয়ে যাওয়ায় ভেতরে জায়গা পেলাম না, বাইরে দাঁড়িয়েই নামাজ আদায় করতে হলো। শুনলাম, পরে আরও একটি জামাত অনুষ্ঠিত হবে। তবে মেয়েদের জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থা ছিল না।

বার্লিন বেঙ্গলি কমিউনিটির শাড়ি উৎসব

নামাজ শেষে বাসায় ফিরে খেয়ে ঘুম। যখন ঘুম ভাঙল, ঘড়িতে সন্ধ্যা সাতটা। অথচ বাইরে তখনো ঝকঝকে রোদ। মেয়ে জানাল, এখানে সূর্য ডোবে রাত নয়টার পরে। উত্তর ইউরোপের গ্রীষ্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হলো এই দীর্ঘ দিন। মনে হলো দিনের আলো যেন মানুষকে আরও কিছুটা সময় উপহার দেয়।

ফ্রেশ হয়ে সন্ধ্যায় রওনা দিলাম। গন্তব্য—বার্লিন বেঙ্গলি কমিউনিটির আয়োজিত শাড়ি উৎসব। আগে থেকেই এই অনুষ্ঠানে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

গিয়ে যেন চমকে উঠলাম। মনে হলো হঠাৎ করেই বাংলাদেশে এসে পড়েছি। শত শত বাংলাদেশি নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। চারপাশে বাংলা ভাষার কোলাহল, পরিচিত মুখ আর পরিচিত সংস্কৃতির আবহ—সব মিলিয়ে এক অন্য রকম অনুভূতি।

সেখানে পরিচয় হলো জাফর ইকবাল ভাইয়ের সঙ্গে। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি জার্মানিতে বসবাস করছেন। পেশায় একজন সোশ্যাল ওয়ার্কার। দীর্ঘ সময় কথা হলো এ দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনযাত্রা, চ্যালেঞ্জ ও টানাপোড়েন নিয়ে। তিনি ফেসবুক গ্রুপ "Bengalisches Kulturforum"-এর সঙ্গে যুক্ত। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করার চেষ্টা করা হয়। মূল লক্ষ্য—প্রবাসে জন্ম নেওয়া দ্বিতীয় ও পরবর্তী প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত রাখা।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা

হলের ভেতরে চলছিল মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। শিশু থেকে বড়—সবাই গান, নাচ ও আবৃত্তির মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখলেন। অনেকেই হয়তো পেশাদার শিল্পী নন, কিন্তু তাঁদের পরিবেশনায় আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিল না।

দর্শকদের মধ্যে শাড়ি পরা কয়েকজন শ্বেতাঙ্গিনীকেও দেখা গেল। সবাইকে চমকে দিয়ে এক পর্যায়ে তাঁরাও বাংলা গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করলেন।

হলের বাইরের খোলা প্রাঙ্গণে বসেছিল ছোট্ট এক মেলা। শাড়ি, চুড়ি, গয়না, দেশি পোশাক আর নানা ধরনের খাবারের সমাহার। মুড়ি-ভর্তা আর বিরিয়ানি যথারীতি ছিল সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

রাত ১০টা বেজে গেছে, অথচ আকাশে তখনো দিনের আলো রয়ে গেছে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি ধীরে ধীরে অনুভব করতে শুরু করেছি। ফেরার পথে স্টেজ থেকে ভেসে আসছিল বাংলা গানের সুর। বিদেশের মাটিতে এমন মুহূর্তগুলো মানুষকে বারবার নিজের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। পৃথিবীর যেখানেই যাই না কেন, নিজের দেশকে আমরা আসলে হৃদয়ের মধ্যেই বহন করে বেড়াই।

আগামীকালের গন্তব্য ড্রেসডেন। আগেই ফ্লিক্সবাসের টিকিট কাটা আছে। শরীরজুড়ে ভ্রমণের ক্লান্তি, কিন্তু উঠতে হবে ভোরে। তাই আর দেরি না করে শুয়ে পড়লাম।